অভিশপ্ত পুকুর

0
তানিয়া||

শেষ পর্ব:


তার মা তন্ময় কে বলল, ওই পুকুরে শুধু শুধু যাওয়া বারন না। ওইটা একটা অপয়া পুকুর। ওই পুকুরে একটা রাহ্মুসে মাছ আর একটা ছোট ছেলে বাস করে।
মা.. মানুষ কিভাবে পুকুরে বাস করতে পারে?
আরে.. ওইটা তো মানুষ না। মরার পর ভূত হয়ে ছেলেটা ওই মাছটার দেখাশোনা করে।

বহু বছর আগে ওই পুকুরের উত্তর দিকে একটা বনেদী পরিবার বাস করত। সে পরিবারের ছোট ছেলের তোর মত খুব মাছ ধরার শখ ছিল। সুযোগ পেলেই ভরদুপুরে এর-সের পুকুরে গিয়ে মাছ ধরত। ছেলের শখের জিনিস দেখে তার বাবা তার জন্য বাড়ির পিছনের দিকটায় বিশাল একটা পুকুর খনন করল। দিন নাই রাত নাই ছেলে সে পুকুরেই পড়ে থাকত, আর মাছ ধরত। হঠাৎ একবার অনেক বন্যা হল, বন্যার পানিতে করে সে পুকুরে একটা বিশাল মাছ এসে উপস্থিত হল। বন্যা কমলে পুকুরে মাছ টাকে দেখা গেল। সেই ছোট ছেলেটা মাছটা দেখে অনেক খুশী। কারন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষ বলত ছেলেটাকে নাকি মাছটার সাথে কথা বলতে দেখা গেছে। ছোট ছেলেটা সব মাছ ধরলেও সে মাছটাই শুধু ধরত না।
মাছটা আস্তে আস্তে আরও বড় হতে লাগল।
এত বড় মাছের ওপর গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষেরই চোঁখ পড়ল। অনেকে তো এত বড় মাছটাকে চুরি করে ধরে শহরে বিক্রি করারও চিন্তাভাবনা করল। কিন্তুু কেউই সুযোগ করতে পারল না, কারন ছেলেটি দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টায় সে পুকুর পাহারা দিত। পুকুরের পাশে বসেই সে পড়াশোনা করত, খেত,খেলত। তাই কেউই মাছ ধরার সাহস করতে পারল না।

কিন্তুু হঠাৎ একদিন সকালে দেখা গেল, পুকুরের সেই মাছটা সহ সব মাছ মরে পুকুরে ভেসে উঠেছে। সব মরা মাছ পুকুরে জাল ফেলে তোলা হল, সে বড় মাছটাকেও তোলা হল। সবাই দেখে অবাক হয়ে গেল মাছটা এত বিশাল। হা করে মরে পড়ে রয়েছে। পরে জানা গেল কারা যেন শত্রুতা করে সে পুকুরের পানিতে ইঁদুর মারার বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল।

মাছটির মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেল সে ছোট্ট ছেলেটি। সে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিল। না খেয়ে সারাহ্মন সে পুকুরের পাড়ে গিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে থাকত।ছেলের মন খারাপ দেখে তার বাবা পুকুরের পানি বিশুদ্ধ করে পুকুরে আবার নতুন করে বড় বড় মাছ ছাড়ল। কিন্তুু কিছুতেই ছেলের মন গলল না। একদিন ভরদুপুরে পা পিছলে পুকুরে পড়ে গিয়ে ছেলেটির মৃত্যু হয়। কিন্তুু অনেকেই বলে, সে রাহ্মুসে মাছটাই নাকি ছেলেটাকে টেনে পুকুরে নিয়ে মেরে ফেলেছিল। এরপর থেকেই সে পুকুর অভিশপ্ত হয়ে গিয়েছে। কারন ছেলেটি এবং তার সেই মাছের আত্মা পুকুরটাকে ঘিরে থাকে। এখনও নাকি সে মাছটাকে পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটতে দেখা যায়, এবং সে ছেলেটা নাকি আজও পুকুর পাড়ে বসে পুকুরটিকে পাহারা দেয়। তারা সোনার কলসী বা বিভিন্ন দামী জিনিস দেখিয়ে মানুষকে লোভ দেখায়। কেউ যদি ভুলক্রমেও সে পুকুরের কাছে যায়, তার মৃত্যু অনিবার্য। পুকুরে টেনে নিয়ে মেরে ফেলে। বলেই তার মা চোঁখ মুছে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তুু ওই রাহ্মুসে ছেলে আর মাছের কবল থেকে তুই কপালগুনে বেঁচে এসেছিস আমার সোনা। বলেই সে তন্ময়ের কপোলে একটা চুমু খেল।

তন্ময় একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল। কারন সে জানে, সে ছেলেটি আর মাছটি রাহ্মুসে নয়। কেউ ভাল সাঁতার না জেনে পুকুরে নামলে তার সবমসময় এটাই মনে হবে কেউ তাকে ধরে পানির তলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কারন তারও তাই মনে হয়েছিল। আর সাথে তো সে পুকুরের নামে আলাদা একটা ভয় আছেই। সব মিলিয়ে সে পুকুরে ডুবে কেউ মারা গেলে দোষ পড়ে সে ছোট্ট ছেলেটা আর তার মাছ গনেশের ওপর।
এজন্যই সে জ্ঞান হারাবার আগ মূহুর্তে ছেলেটি বারবার তাকে বলছিল, বেঁচে উঠতে। তা না হলে তার মৃত্যুর জন্য সবাই তাকে আর তার গনেশকে দোষ দিবে।

তন্ময় উঠে বসে তার মাকে এক গ্লাস পানি দিতে বলল, মা পানি আনতে চলে গেল।
তন্ময় মনে মনে চিন্তা করছে, সবাই কত নিষ্ঠুর!!
নিষ্পাপ ছেলেটি এবং মাছটির মৃত্যুর পরও সবাই সে নির্দোষ ছেলে আর মাছটাকেই দোষারোপ করছে, যে ছেলেটা আর মাছটাই কিনা তার জীবন বাঁচিয়েছে। আজ যে সে বেঁচে আছে, তার সমস্ত অবদান-ই ওই ছেলে আর তার গনেশের। কোথা থেকে যে অচেনা সে ছেলেটা আর তার গনেশের কথা ভেবে কান্না পাচ্ছে, কিছুই সে বুঝল না। সে হঠাৎ ভাবল সবাইকে সত্য জানাবে। সবার সত্য জানা উচিত।

তার মা এল পানি নিয়ে, পানি খেয়ে সে তার মাকে বলল- মা আমি কি একটা কথা বলতে পারি?
তার মা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল- অবশ্যই পারিস। কি কথা, বল!
পরহ্মনে তন্ময় কিছুই বলল না।
কারন সে জানে এ সত্যি কথা তার মা কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। কেউই বিশ্বাস করবে না।
তার মা তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, কিরে কি হল, বল।
না.. মা.. কিছু না..

তন্ময় একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল, পৃথিবী তে যতদিন সে বেঁচে থাকবে, এ সত্য শুধু সে একাই জানবে।
আর কেউই কখনো জানবে না…..!!!!!!

Comments

comments