অভিশপ্ত পুকুর

0
তানিয়া||

পর্ব ঃ ১


ছেলেটির সাথে তন্ময়ের প্রথম পরিচয় মাছ মারতে গিয়ে।
শীবকান্দি গ্রামের সবচেয়ে চঞ্চল এবং ডানপিটে ছেলে তন্ময়। তার শুধু একটাই নেশা, মাছ মারা। এই নেশার জন্য সে যে কত বকুনি আর মার তার মার হাতে খেয়েছে তার কোন হিসেব নেই। তার মা তার এই নেশাকে ভয় করে, কারন তন্ময়ের বাবাও তন্ময়ের জন্মের দু বছরের মাথায় মাছ মারতে গিয়ে মারা যায়। তার পর থেকে তন্ময়ই তার সব।

কিন্তুু তন্ময় ও বাবার পথই ধরল। সে কারনেই তার মায়ের দুঃশ্চিন্তার সীমা নেই।

শীবকান্দি গ্রামে একটি প্রচলিত কথা আছে, উত্তরের কাজী পাড়ার পুকুরে অদ্ভুত কিছু রয়েছে। অনেকেই নাকি সে পুকুর থেকে নানা রকম কলসী, পাত্র ভেসে উঠতে দেখেছে। তাই শীবকান্দি গ্রামের কেউই সে পুকুরে মাছ মারতে যায় না। আর তাছাড়া সে পুকুর এখন আর কেউ ব্যবহারও করে না। বড়শী ফেললেও হয়তো সে পুকুর থেকে ময়লা- আবর্জনাই উঠে আসবে।

তন্ময় আর তার বন্ধুরা আজ মাছ মারতে গিয়েছে, চিট্টু ব্যাপারীর গোলাকান্দা পুকুরে।
কিন্তুু বারবার বড়শী ফেলেও তারা কোন মাছের নাগাল পেল না। তারপরও তারা হাল ছাড়ে নি, এরপরও তারা আরও কয়েকটা পুকুরে ঢু মারল। কিন্তুু সব জায়গায় একই অবস্থা। সামান্য কয়েকটা ছোট পুঁটি মাছ ছাড়া তাদের বড়শী তে কোন মাছ-ই গাঁথল না।
তার বন্ধুরা নিরাশ হয়ে বলল, আজ বরং বাদ দেই। মা বকুনি দেবে, বলেই তারা চলে গেল। তন্ময়ের ভীষণ মন খারাপ হল। কারন আজ সে মাকে বলে এসেছিল, মাঝাারী একটা কাতল ধরতে পারলে সেটা যাতে তার মা খুব ভাল করে রেঁধে দেয়, রাতে তবে সে তার বন্ধুদের বাড়িতে খেতে আসতে বলবে। ধ্যাৎ… কিছুই হল না।

কিন্তুু তারপরও সে হাল ছাড়ল না। সে মনে মনে চিন্তা করল, সে উত্তরের কাজী পাড়ার পুকুরে যাবে। যদিও সে পুকুরে যাওয়া নিষেধ। তারপরও সে একটা শেষ চেষ্টা করতে চায়। যেই ভাবা সেই কাজ। সে রীতিমত পুকুরের সামনে এসে বড়শী তে কেঁচো গেঁথে পুকুরে ফেলল। দুঘন্টা টানা চেষ্টা করার পর একটি ছেঁড়া জুতো ছাড়া আর কিছুই উঠল না

শেষে সে নিরাশ হয়ে চলেই যাবে এমন সময় বিশাল বড় একটি মাছ ঘাঁই দিয়ে লাফিয়ে আবার পানিতে পড়ল। তন্ময় চিন্তাই করতে পারল না এত বড় একটি মাছ এ পুকুরে থাকতে পারে।

সে আবার পুকুরে বড়শী ফেলতে যাবে, এমন সময় তার পেছন থেকে একটি কন্ঠ বলে উঠল-

তুমি আমার গনেশ কে ব্যাথা দিয়েছ?

সে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল- তারই সমান নয়- দশ বছরের একটি ছেলে তার পেছনে এসে দাড়িয়েছে।

ছেলেটি আবার বলে উঠল – বল কেন ব্যাথা দিয়েছ আমার গনেশকে??

তন্ময় এবার বলল কোন গনেশ??
যে মাছটি এইমাত্র লাফিয়ে উঠল সেই আমার গনেশ।
আমি তো তাকে কোন ব্যাথা দেই নি।
বুঝলাম। কিন্তুু তুমি এ পুকুরের ধারে কেন এসেছো? তুমি জানো না এ পুকুরের কাছে আসা নিষেধ!!
তন্ময় একটু মন খারাপ করে বলল, হ্যা জানি। কিন্তুু আজ আমি আর আমার বন্ধুরা কোন মাছ-ই ধরতে পারি নি। ওরা বাড়ি চলে গেলে, আমি তাই মাছ পাবার আশায় এখানে এসেছি। কিন্তুু এ পুকুরে কোন মাছ-ই নেই।

এবার ছেলেটি অবাক হয়ে বলল- কে বলেছে? মাছ নেই! আমি তো প্রায়ই এ পুকুর থেকে মাছ ধরি। তুমি যদি চাও তুমিও মাছ ধরতে পার কিন্তুু আমার গনেশকে কোন আঘাত করবে না।
নাও এবার তুমি তোমার বড়শী ফেলো।
কিন্তুু আমি তো টানা দুঘন্টা চেষ্টা করেছি কোন মাছ-ই ছিল না।
আহা.. ফেলই না।
তন্ময় অনিচ্ছা স্বত্তেও বড়শী ফেলল। সে অনেকখানি অবাক হল, বড়শী ফেলার সাথে সাথেই বড়শীতে মাছ এসে ধরা দিতে লাগল।
তন্ময়ের খুশী যেন আর ধরে না, সে মাছ ধরার পর ঝোলা ভর্তি করে বাড়ি এল।

কিন্তুু মাকে সে কিছুই বলল না। কারন মা যদি শোনে, উত্তরের পুুকুরে সে মাছ ধরতে গিয়েছে, মার একটাও মাটিতে পড়বে না। তাই সে কিছুই বলল না।

এভাবে সে বেশ কিছুদিন সে পুকুর থেকেই মাছ ধরে বাসায় আনতে লাগল। আর ছেলেটির সাথেও তার ভাল সখ্যতা গড়ে উঠল। তন্ময় সে পুকুরে একা যেতেও আর ভয় পেল না। সে বুঝতে পারল, গ্রামের মানুষেরা পুকুরটিকে নিয়ে যেসব গল্পকাহিনী বলত তা সবই মনগড়া।

তাই তন্ময় তার বন্ধুদের ছেড়ে, ছেলেটির সাথেই প্রতিদিন মাছ ধরতে লাগল। তন্ময় জানতে পারল, ছেলেটির ও তার মত মাছ ধরার নেশা। আর এ পুকুর তার প্রান। এ পুকুরে তার বন্ধু গনেশ আছে। তার যখন খুব মন খারাপ থাকে সে গনেশের সাথে এসে গল্প করে। গনেশও তার প্রতি কথার উত্তর দেয়। সে পুকুরের পানিতে নামলে গনেশ এসে তার সাথে ঘেষাঘেষি করে। তারা একসাথে গোসল করে। গল্প করতে করতেই বেলা পড়ে যায়। তন্ময় বাড়ি ফিরে আসে।

সে মনে মনে চিন্তা করে, আগামীকাল সে তার বন্ধুদের সে পুকুরে নিয়ে যাবে। যদিও তার বন্ধুরা সে পুকুরে ভয়ে যেতে চাইবে না কিন্তুু সে তার বন্ধুদের বোঝাবে, সে পুকুরে মাছ ধরতে গেলে নিষেধ করার মত কেউ নেই, আর অনেক মাছও পাওয়া যাবে।

পরদিন তার বন্ধুরা সে পুকুরে যেতে না চাইলে, সে বুঝিয়ে সুজিয়ে নিয়ে যায়। তারা গিয়ে বড়শী ফেলল, কিন্তুু কোন মাছ-ই পেল না। দীর্ঘহ্মন চেষ্টা তাদের বিফলে গেল। তন্ময় কিছুই বুঝতে পারল না, এত মাছ গেল কোথায়??

তার বন্ধুরা ভয় পেয়ে তাকে ছেড়ে চলে গেল।
তন্ময় একা একা পুকুরপাড়ে ছেলেটির জন্য অপেহ্মা করতে লাগল। হঠাৎ পানিতে ঘাঁই মেরে গনেশ নামের মাছটি লাফিয়ে উঠল। তন্ময় পাড় থেকে নেমে পানির কাছে গেল, পানিতে নামতেই হঠাৎ সে পানিতে পিছলে পড়ে গেল এবং তার মনে হল পানির নিচ থেকে তার পা দুটি ধরে কেউ তাকে টেনে পানির নিচে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। সে কিছুতেই তার পা ছাড়াতে পারছে না। পানি তার পেটে মুখে ঢুকে যাচ্ছে। সে যতই উপরে উঠার চেষ্টা করছে ততই কেউ তাকে পানির নিচে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। সে মাগো মাগো বলে দুবার চিৎকার করে উঠল।

ওইদিকে বেলা পড়ে আসছে , ছেলের কোন খোঁজ না পেয়ে তন্ময়ের মা অতিব্যস্ত হয়ে এ পাঁড়া ও পাঁড়া ঘুড়ে তন্ময়ের ব্যাপারে জিঙেস করতে লাগল। অবশেষে তার এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে জানতে পারল, যে তন্ময় সকালে তাদের নিয়ে উত্তরের কাজীপাড়ার পুকুরে গিয়েছিল। তারা চলে আসলেও তন্ময় আর তাদের সাথে ফেরে নি।

তন্ময়ের মা পাগলপ্রায় হয়ে গ্রামের আরও ছয়-সাত জন মানুষ নিয়ে উত্তরের পুকুরের দিকে ছুটে গেল। গিয়ে তন্ময়কে সে পুকুরপাঁড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখল। তন্ময়ের সমস্ত শরীর ভেজা। তন্ময়ের মা দেখেই তন্ময় বলে চিৎকার দিয়ে উঠল। সবাই মিলে ধরাধরি করে তন্ময়কে বাড়িতে নিয়ে আসল।

জ্ঞান ফিরলে তন্ময় নিজেকে তার বিছানায় আবিষ্কার করল। দাওয়ায় বসে তার মা বিলাপ করে কাঁদছে। গ্রামের অনেক মানুষ তাদের বাড়িতে এসে জমা হয়েছে। কিন্তুু সে কিছুতেই বুঝল না, বাড়িতে সে কি করে এল।

তার মনে আছে, কাজীপাড়ার পুকুরে সে পিছলে পড়ে গিয়েছিল, আর পানির নিচে থেকে কেউ তার পা ধরে টানছিল। তার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, সে প্রায় ডুবেই বসছিল আর তখনই কোথেকে সে ছেলেটি আর তার গনেশ নামক মাছটি এসে তাকে বাঁচাল। অনেক কষ্টে টেনে তুলল পাড়ে।

তন্ময়ের চোঁখ বন্ধ হয়ে আসছিল, সবকিছু কেমন যেন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল। সে মূহুর্তে ছেলেটি তাকে কেঁদে কেঁদে বলছিল- প্লিজ তুমি বেঁচে উঠ। তুমি মরতে পার না। তুমি মরলে সব দোষ আমার আর গনেশের হবে।
বলতে বলতেই ছেলেটি পাড় থেকে আস্তে আস্তে নেমে গনেশের কাছে গিয়ে হঠাৎ পুকুরের পানির সাথে মিশে গেল। তন্ময় কিছু বোঝার আগেই জ্ঞান হারালো। কিন্তুু কিভাবে বাসায় এল কিছুই বুঝল না।

তার জ্ঞান ফিরেছে দেখেই তার মা তার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে আরও জোরে কাঁদতে লাগল। গ্রামের মানুষরা বলাবলি করতে লাগল, লাখ শুকরিয়া যে আমগো তন্ময় ওই পুকুরে ডুইবা মরে নাই । কেউ বা বলতে লাগল, ওই অপয়া পুকুরের মাছ আর ওই রাহ্মুসে পোলার হাত থেইকা তন্ময় কপালগুনে বাঁইচা ফিরছে। বিভিন্নজনের বিভিন্ন কথা শুনে তন্ময় তার মাকে জিঙেস করল মা সবাই এমন কেন বলছে?

চলবে………

Comments

comments