এইডস

0

এইডস || শা হ রি য়া র কা সে ম

 

এবারও চাকুরীটা হলনা। হয়ত কপালে সরকারী চাকুরী নেই তাই আর হচ্ছেনা। হওয়ারও কোন কারণ দেখছেনা শামীম। শামীম গরীব ঘরের নম্র, ভদ্র ও মেধাবী ছেলে। এযুগে যে মেধার কোন দাম নেই সেটা শামীম বুঝেছে গেল সপ্তাহে খাদ্য অধিদপ্তরে ভাইবা ফেস করে। বাবা মরা ছেলে শামীম। ভাই বোন নেই। সংসারে মা’ই তার সব। পরের বাড়ীতে ঝিঁ এর কাজ করে পড়াশোনা করিয়েছেন শামীমকে। অাঁধ বুড়ো মায়ের একটাই স্বপ্ন ছিল। ছেলেটা পড়াশোনা শেষ করে চাকুরী করবে। চাকুরীতো আর মায়ের হাতে মোয়া নয়। যে ইচ্ছে করলেই চাকুরী পেয়ে যাবে। অবশেষে, দূরের এক অাত্মীয়ের হাত ধরে শামীম ঢাকা গেল। দু’য়েক দিন এই অাত্নীয়ের বাসায় থাকার পর একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে যোগ দিল শামীম। প্রথম প্রথম অফিসের কাজ সামলিয়ে উঠতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে শামীমের। কারণ মানবিকের ছাত্র শামীম। অার কাজ করছে একাউন্সে। এ অবস্হায় যা হওয়ার কথা তাই হচ্ছে শামীমের। যদিও পরে নিজেকে খাপ খাওয়াতে খুব কঠিন হয়নি। কারণ শামীম ভদ্র স্বভাবের ছেলে হওয়ায় অফিসের সবার সাথে সু সম্পর্ক গড়তেও সময় নেইনি। অল্পদিনেই শামীম অফিসের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী হয়ে গেল। এমনকি তাঁর বসের কাছেও। এভাবে চলতে থাকল শামীমের দিন। এখন তাঁর মাস শেষে বেতনও ভাল। মাসে মাসে মাকে খরচ বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দিচ্ছে। এদিকে মাও বেশ সুখেই অাছে।

নতুন বাসাটা ছোট হলেও বেলকুনিটা বেশ বড়সড়। শামীম পছন্দ করেই বাসাটা নিয়েছে। রাতে যখন অাকাশে ভরা জোৎস্নায় নক্ষত্ররা খেলা করে তখন শামীম বেলকুনিতে বসে এ দৃশ্য উপভোগ করে। অফিসের কাজের জন্য এখনো দিনে বেলকুনিতে বসার সুযোগ হয়নি। তবে বন্ধের দিন একটু আঁধটু বসে। তবে এখন রোজ বিকেলে আঁধ ঘন্টা বেলকুনিতে বসা যেন শামীমের দৈনিক রুটিনে পরিণীত হয়েছে। বেলকুনির বরাবর অপর পাশের বিল্ডিংটা বেশ চমৎকার। মন মাতানো রঙে সাঁজানো বিল্ডিংটার প্রতিটি কোণ। বেলকুনিতে বসে প্রতিনিয়ত ঐ পাশে চেয়ে থাকে শামীম। শুধু বিল্ডিংটার দিকে চেয়ে থাকে তা কিন্তু নয়। অাবছা আলোয়ে মাঝে মাঝে দেখা যায় ঐ পাশের বিল্ডিংয়ে এক ডানাকাটা পরী। যা দেখে শামীম পুরোপুরি মুগ্ধ। অফিসের কাজ দ্রুত শেষ করে সে এখন এই পরীর প্রেমে হাবুডুবু খায়। মেয়েটিও যে শামীমকে সায় দিচ্ছেনা তা কিন্তু নয়। কিছু দিনের মধ্যেই দু’জন দু’জনায় চোঁখে চোঁখ রেখে কি যে কাব্য রচনায় ব্যাস্ত। মেয়েটির নাম সুনয়না। তার চোঁখে যেন এক সম্মোহনী যাদু আছে। কেউ সুনয়নার চোঁখে চোঁখ রাখলেই সে চোঁখের যাদু তাঁকে ঘ্রাস করবে। যেমনটি শামীমের হয়েছে। হয়েগেছে নিজেদের মোবাইল নম্বর দেয়া নেওয়াও।

— এই কাল তোমার অফিস বন্ধ(সুনয়না)?

— হ্যা। কেন (শামীম)?

— চল্ বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাই?

— হ্যা, নিশ্চয়। শামীম এই প্রথম সুনয়না হাত ধরে হাটছে। যেন পাঁচ বছরের দাম্পত্য জিবন। সুনয়নার কোমল হাতে স্পর্শে শামীম দেওলিয়া হতেও রাজি। গার্ডেনে সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে ফিরল নিজ নিজ বাসায় শামীম আর সুনয়না। সুনয়না যাওয়ার অাগে অবশ্য শামীমকে তার বাসায় যেতে বলেছেও বেশ। সুনয়নার কাছে যেতে তর সয়ছেইনা শামীমের। প্রেমের টানে গেল শামীম সুনয়নার বাসায়।

— তুমি একা এই প্লাটে থাকো (শামীম)?

— হ্যা, কেনো (সুনয়না)?

— না, তেমন কিছু নয়।

— তুমিও তো একা একা একটা প্লাটে থাকো। কিন্তু অতশত ভেবে আর জানা হলনা শামীমের। যে, সুনয়না কেন একা এত বড় প্লাটে থাকে। বা কি করে সুনয়না? বা এত টাকা কোথায় পায় সে? বিলাসবহুল প্লাটের ভাড়া প্রতি মাসে কম হলেও পনের হাজার টাকা গুনতে হবে। কিন্তু সুনয়নার প্রেমে অন্ধ হয়ে হয়ত শামীম এত কিছু দেখতে পায়নি। মূলত_ সুনয়না একজন দেহ বিক্রেতা। প্রতি রাতে টাকার দায়ে একেক জনের সজ্জাসঙ্গী হয়। সুনয়না শামীমকে বার বার বুঝাতে চাইলেও শামীম বুঝতে ব্যর্থ প্রেমের মোহে পড়ে। এভাবে এখন প্রতি রাতেই শামীম সুনয়না সাথে দেখা করে তাঁর রুমে। দু’জনার মাঝে হয়ে গেছেও দেহের অাদান প্রদান। হয়ত এভাবেই কাটছে রাতের পর রাত… এদিকে গ্রাম থেকে বার বার মা ফোন দিচ্ছে শামীমকে। বাবা তুই এবার ছুটিতে আসলে পাশের বাড়ির রোমানাকে বউ করে ঘরে আনব। ও খুব ভাল মেয়ে। এবার বি,এ পাশ করেছে। আমাকে রোমানা বেশ যত্ন আত্নি করে। তর বউ হিসেবে মানাবেও খুব। কিন্তু শামীম প্রতিরাতে সুনয়নাকে পাশে মানিয়ে নিয়েছে। বেলকুনিতে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সুনয়নাকে দেখার জন্য ছটপট করছে শামীম। কিন্তু দরজাটা খোলা নেই। শামীম ফোনে ট্রাই করল। কিন্তু সুনয়নার ফোন সুইচটঅফ বলছে। শামীমের মাতায় বাঁজ পড়েছে মনে হল। তাড়াতাড়ি সুনয়নার প্লাটে গেল। গিয়ে দেখল দরজা তালা দেওয়া। এই মুহুর্তে কিছুই মাতায় আসছেনা শামীমের। খোঁজা খুঁজি করে প্লাটের মালিকের ফোন নম্বর জোঁগাড় করল। এবং তৎক্ষণাত ফোনও করল।

— হ্যালো, সুনয়না কোথায় (শামীম) ?

— হ্যা ভাই । সুনয়না চলে গেছে (প্লাটের মালিক)

— কেন ? কোথায় চলে গেছে ?

— সুনয়নাতো থাকতে অাসেনি ।

— মানে ? মানে__ আমি সুনয়নাকে উজান বাজার থেকে নিয়ে এসেছিলাম। এর মধ্যে সে অামার প্লাটেই ছিল। আমি ব্যবসার কাজে ভারতে কিছু দিন ছিলাম। এসে সুনয়নাকে মেডিকেল টেষ্ট করিয়েছি। দেখলাম ওর মাঝে এইচঅাইভি ভাইরাস। তাই সুনয়নাকে দিয়ে তো অার হবেনা। সে জন্যে সকালেই তাঁকে পাঠিয়ে দিয়েছি। শালা দালালকে বলেছিলাম, একদম কচি একটা মাল দিতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ভাবছি এবারনিজেই গিয়ে একটা পছন্দ করে নিয়ে অাসব। এ কথা শুনে যেন শামীম অাকাশ থেকে ধপাস করে মাটিতে পড়ল। কি হতে কি হয়ে গেল। সুনয়নার যদি এইচঅাইভি থাকে তাহলে আমিও এইডসে আক্রান্ত। না না না তা হতে পারেনা__ এই মুহুর্ত্যটা এখন দুঃস্বপ্নের মত মনে হচ্ছে শামীমের। খেয়ালীতেই নিজের গায়ে কয়েক বার দাগ কাটল শামীম। কিন্তু না, এটাই চরম সত্য। এক দৌড়ে অাশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেল শামীম। এইচঅাইভি টেষ্ট করাল। টেষ্ট পেপারে চোঁখ বুলালেতেই যেন চোঁখে অন্ধকার নেমে অাসছে মুহুর্তেই। হ্যা, শামীমও এইডসে আক্রান্ত। নিমিষেই মনে পরছে বৃদ্ধ মায়ের আকুতি- মিনতিপূর্ণ স্বর। “আয় বাবা এবার ঘরে ফিরে আয়”। হ্যা, নিশ্চয় কিছু দিনের মাঝে শামীম ঘরে ফিরবে। তবে সংসার ঘরে নয়। আপন ঘরে। এভাবেই হয়ত অন্ধ প্রেমের মোহে পড়ে কত যুবক শামীমের মত নিঃস্ব হয়ে ঘরে ফিরছে এর অন্ত নেই…

Comments

comments