কোটার কৌটায় বন্দি মেধাবীরা : নিস্তার পাবে কবে?

0

মুক্তমত||মো. মাসুদ রানা

বাংলাদেশের চাকরী প্রার্থী তরুণ তরুণীরা আজ কোটার ছোঁবলে ছটফট করে মানসিক যন্ত্রনায় দিন কাটাচ্ছে।এই কোটা পদ্ধতির আধিক্যতার কারনেই অনেক চাকুরীপ্রার্থী ভাল পরীক্ষা দিয়েও চাকরীর পরীক্ষায় উক্তীর্ণ হতে পারেনা।বিভিন্ন কোটার আধিক্যের কারনে দেশের সাধারন ছাত্ররা সরকারী চাকরীর আশা করলেও সে আশা পূরণ আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে। হয়তবা কারো কারো ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় সরকারী চাকরী কোটা ছাড়াই পেয়ে যায়, বাকিদের সরকারী চাকরীর স্বপ্ন আজীবন স্বপ্নই থেকে যায়।

এদেশের সরকারী চাকরীতে (১ম ও ২য় শ্রেণী) বিভিন্ন প্রকার কোটায় ৫৫ ভাগ ( ৫৫ ভাগ কোটায় পদ সংখ্যা পূরণ না হলে ১ ভাগ প্রতিবন্ধী কোটায় নেওয়া হয় অর্থাৎ মোট ৫৬ ভাগ)  এবং মেধায় ৪৪ ভাগ প্রার্থী নিয়োগ দেওয়া হয়।দেশের মোট জনসংখ্যার ২.৬৩ ভাগ লোকের জন্য সরকারী চাকরীতে কোটা রয়েছে ৫৬ ভাগ আর বাকী ৯৭.৩৭ ভাগ মানুষের জন্য  রয়েছে মাত্র ৪৪ ভাগ। কোটার এই অনুপাতটি কি আদৌ একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানায়?  তৃতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকরীতে কোটার আরো বেহাল দশা। এখানে মেধায় কোন প্রার্থী নিয়োগ দেওয়া হয়না অর্থাৎ কোটায় ১০০ ভাগ নিয়োগ হয়। এই যদি হয় একটা দেশের নিয়োগ প্রক্রিয়ার অবস্থা তবে সাধারন মেধাবী চাকরীপ্রার্থী কেমনে সরকারী চাকরীর আশা করতে পারে? পৃথিবীতে বাংলাদেশের মত আর এমন কোন দেশ আমার জানা নাই যে  যেখানে মেধার চেয়ে কোটাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায় কোটা নিয়ে এর আগে একটা লেখা লিখছিলাম।সেই লেখার সূত্র ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক চাকরী প্রার্থী বড় ভাই আমাকে মেসেজ করছিলেন। তিনি আমাকে জানালেন, পিটিআই ইনস্ট্রাক্টর পদে ৯৯ টা পদের বিপরীতে (যার মধ্যে ৯১ টা পদ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এবং ৮ টা পদ ছিল সাধারণ প্রার্থীদের জন্য)  ভাইভা দিয়েছিল ১৯৪ জন। তার মধ্যে তিনিও ছিলেন। ঐ পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৯১ জনের মধ্যে ১৮ জন প্রার্থী পাওয়া যায়।বাকি ৭৩ টা পদ ফাঁকা রেখেই নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। শুধুমাত্র পদ সংরক্ষনের কারনে ঐ বড় ভাইয়ার সরকারী চাকরী করার স্বপ্ন পূরণ হলনা। আমি তাকে বললাম, ‘আপনার জন্য হয়ত আরো ভাল কিছু অপেক্ষা করছে, তাই এ চাকরী হয়নি। ‘ তিনি বললেন, ‘ তার আর সুযোগ নেই ভাইয়া, কারন আমার চাকরীর বয়স শেষ। ‘ সেদিন খুব খারাপ লেগেছিল আমার।

কোটায় প্রার্থী না পাওয়া গেলে পদ সংরক্ষনের নিয়ম থাকায় প্রতিটা সার্কুলারে অনেক পদ ফাঁকাই থেকে যায়। গত ২৫ শে ফেব্রুয়ারি অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদের নিয়োগের চুড়ান্ত রেজাল্ট প্রকাশিত হয়েছে। এতে ২৬৮ টা পদের মধ্যে ১৯৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।  ৬৪ জন কোটার প্রার্থী না পাওয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এই ৬৪ টা পদ যদি মেধা থেকে পূরণ করা হত তবে ৬৪ টা মেধাবী ছেলে ও তার পরিবারের দুঃখ মোচন হত। এরকম পদ সংরক্ষণের ইতিহাস অতীতে বিসিএস ক্যাডার নিয়োগ পরীক্ষাতেও ছিল। গত ২৮ তম বিসিএস থেকে ৩৫ তম বিসিএস নিয়োগ পরীক্ষা পর্যন্ত মোট সাড়ে চার হাজারেরও বেশি পদ সংখ্যা ফাঁকা রাখা হয়েছিল কোটায় প্রার্থী না পাওয়ার কারনে। অবশ্য পিএসসি সরকারের অনুমতি নিয়ে কোটায় প্রার্থী না পেলে তা মেধা থেকে পূরণ করার প্রথা চালু করছে। “আমি এজন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি পিএসসি’র প্রতি। তারই ধারাবাহিকতায় অতি সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, কোটায় প্রার্থী না পেলে মেধা থেকে পদ পূরণ করা হবে। নিঃসন্দেহে বেকার চাকরী প্রত্যাশীদের জন্য সুখবর এটি ”

রাষ্ট্রীয় কাজ ভালভাবে সম্পাদনের জন্য একজন চৌকস, মেধাবী কর্মকর্তার প্রয়োজন। কিন্তু এটা তেতো হলেও সত্য যে, কোটায় যারা চাকরী পায় তাদের মেধা তুলনামূলক ভাবে কম। কারন আপনি বিসিএস চাকরীর নিয়োগ পরীক্ষায় দেখবেন যে একজন কোটাধারী ৪২০ মার্কস পেয়ে এডমিন ক্যাডার পায় অন্যদিকে আর একজন কোটাবিহীন প্রার্থী ৫২০ পেয়েও এডমিন ক্যাডার পায়না। একজন কোটাধারী মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ৪৫ পেয়ে সরকারী মেডিকেলে চান্স পায় অপরদিকে কোটা বিহীন একজন পরীক্ষার্থী ৬৮ পেয়েও সরকারী মেডিকেলে চান্স পায়না। তবে আপনি কাকে মেধাবী বলবেন?  কোটাধারী প্রার্থী নাকি কোটাবিহীন প্রার্থীকে?

সরকার কোটা পদ্ধতি চালু করছে কোন একটি অনগ্রসর জাতির জন্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে কোটা যেসব জায়গায় প্রয়োগ হচ্ছে তারা কি সবাই অনগ্রসর জাতির মধ্যে পড়ে?

এবার একটু বিভিন্ন প্রকার কোটা নিয়ে পর্যালোচনা করি। প্রথমেই আসি, মুক্তিযোদ্ধা কোটার ব্যাপারে। মুক্তিযোদ্ধারা এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের অবদান কখনোই ভোলার নয়। তাদেরকে ভাল রাখতে বর্তমান সরকার যা করেছে এর আগে কোন সরকার এমনটা করেনি। বর্তমান সরকার তাদেরকে প্রতি মাসে ভাতা দিচ্ছে(আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন), ভূমিহীন কিংবা বসতবাড়িহীন মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি তৈরী করে দিয়েছে। এসব করা হচ্ছে তাদের উন্নত জীবন যাপনের জন্য। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের পারিবারিক ভাবে স্বচ্ছল হওয়ার জন্য সরকারী চাকরীতে ৩০  ভাগ কোটা ব্যবস্থা চালু করেন রাষ্ট্র। কালের পরিক্রমায় তা আজ তাদের ছেলে মেয়ে ও নাতী নাতনীদের জন্যও চালু করা হয়েছে।একটা পরিবারকে অগ্রসর করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের ছেলে মেয়েদেরকে কোটা সুবিধা প্রদান করাটাই যথেষ্ট। এই সুবিধা নাতী নাতনীদের কোন যুক্তিতে দেওয়া হয় তা আমার মাথায় আসেনা।দেশের ০.১৩ ভাগ মুক্তিযোদ্ধার জন্য কি ৩০ % কোটা রাখা আদৌ যৌক্তিক? দেশের বিবেকবান জ্ঞানীদের প্রতি প্রশ্ন রইল। আর এই ৩০% কোটা কি সব প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কাজে লাগাতে পারে? বর্তমানে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা অনেক হয়ে গেছে।যারা একসময় রাজাকার ছিল তারাও আজ মুক্তিযোদ্ধার দলে। বেশ কিছুদিন আগে আমরা একটা টিভি চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারি  হাজার হাজার ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা টাকার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়েছে। সম্প্রতি আরো প্রায় দেড় লাখ লোক মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাওয়ার জন্য আবেদন করছেন। না জানি ভবিষ্যতে আর কতগুলো নতুন মুক্তিযোদ্ধা তৈরী হবে? আর একটা বিষয় লক্ষ্যনীয়, বর্তমান সরকারের অনেক এমপি মন্ত্রী রয়েছে যারা মুক্তিযোদ্ধা। তাদের সন্তানরাও নিয়ম অনুযায়ী কোটায় সরকারী চাকরী পেতে পারে। কিন্তু কোটা তো শুধুমাত্র অনগ্রসর গোষ্ঠী কিংবা মানুষের জন্য চালু করা হয়েছে। তবে কি বর্তমান সরকারের সেই এমপি মন্ত্রীদের অনগ্রসর মানুষ বলব আমরা?

তাই মুক্তিযোদ্ধা কোটা শুধুমাত্র অনগ্রসর মুক্তিযোদ্ধার জন্যই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

দেশের বুদ্ধিজীবিরা টক শো তে সারাদিন নারীদের অগ্রসর হওয়া, ক্ষমতায়নে নারীদের সাফল্য নিয়ে কথা বলে। ঠিক একই টেবিলে টক শো তে বসে আবার কোটার জন্য নারীদেরকে তারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করে। বাস্তবিক অর্থে নারীরা এখনো পুরুষের সমকক্ষ না হতে পারলেও কাছাকাছি চলে আসছে। তাই নারীদের কোটা ১০% রাখার কোন অর্থ খুঁজে পাইনা আমি।

জেলা কোটা যখন করা হয়েছিল তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল কম এবং জেলার সংখ্যা ছিল ১৭ টি। আর এখন তা বেড়ে হয়েছে ৬৪ টি তে। বর্তমানে জেলা কোটা রাখা যেতে পারে শুধুমাত্র পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর জন্য। কিন্তু সেটা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাখতে হবে।এবং সেই সময় পার হয়ে গেলে জেলা কোটা বন্ধ করতে হবে। আর এর পরিমান কোনভাবেই ৩ ভাগের বেশি করা যাবেনা।

উপজাতি কোটায়ও যেহেতু প্রার্থী না থাকায় পদ সংখ্যা পূরণ হয়না তাই উপজাতি কোটা ৫% থেকে ৩% করা দরকার।

এদেশে মেধার মূল্যায়ন সর্বাগ্রে দিতে হবে, অবমূল্যায়ন করা যাবেনা। মেধার অবমূল্যায়ন করলে দেশের উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এদেশের মানুষেরা পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করেছিল বিভিন্ন প্রকার বৈষম্য ও অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে মুক্তি পেলেও এদেশের সাধারন মানুষ চাকরীর নিয়োগ বৈষম্য থেকে এখনো মুক্তি পায়নি। তাই চাকরীতে নিয়োগ বৈষম্য দূর করতে হবে।

কোটা ব্যবস্থায় কোন একটা পরিবারের শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি কোটা এক বার ব্যবহার করতে পারবে ( বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ব্যবহার করলে চাকরীর নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যবহার করতে পারবেনা) এরকম নিয়ম চালু করতে হবে। কোটা ব্যবস্থা যেহেতু অনেকদিন ধরে আমাদের দেশে চালু রয়েছে তাই অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই এখন অগ্রসর হয়েছে। তাই কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করা এখন সময়ের দাবী। আমার মতে সর্বপ্রকার কোটা মিলিয়ে মোট ২০ ভাগের অধিক করা কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত হবেনা।

তাই দেশের মাদার অব হিউম্যানিটি খ্যাত মমতাময়ী মা, জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি মানবিক আবেদন, প্লিজ আপনি দয়া করে কোটা পদ্ধতির সংস্কার করে মেধাবীদের দেশের সেবা করার সুযোগ দিন।

 

লেখক : মো. মাসুদ রানা

শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

 

Comments

comments