গানকে ছবির মেরুদণ্ড করে আবারো অঞ্জনের নতুন ছবি ‘আমি আসবো ফিরে’

0
ছবিঃ অঞ্জন দত্তের নতুন ছবি ‘আমি আসবো ফিরে’-এর পোস্টার

বিনোদন ডেস্ক 

জীবন যত যন্ত্রমুখোপেক্ষী হচ্ছে বা বলা যায় ‘আধুনিক’ হচ্ছে। ততই জীবনের জটিলতা বাড়ছে। আন্তর্সম্পর্কের সমীকরণ ভেঙে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। নীতিবোধের বদল ঘটছে। পারস্পরিক মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা যেমন বাড়ছে তেমনই আমরা সভ্যতার আড়ালে হয়তো বা আদিম সভ্যতার দিকেই এগোচ্ছি, না পিছোচ্ছি, তানিয়েও বহু সময়ে দ্বিধাচিত্ত। এমনটা ঘটেই চলেছে গত কয়েক বছর ধরে। বিশেষভাবে কলকাতা শহরের আপার মিডলক্লাস পরিবারে। পরিচালক অঞ্জন দত্ত তাঁর আগের একাধিক ছবিতেও এই বিষয়টাই এনেছেন। ‘আমি আসবো ফিরে’তে আবারও এই বিষয়টাই ছবির কেন্দ্রবিন্দু। চার-পাঁচটি চরিত্র, সাংসারিক অশান্তি, পারিবারিক ঝামেলা, অনিশ্চয়তা, রোজকার টালমাটাল অবস্থা, বিয়ে ভাঙা-গড়া, অন্য সম্পর্ক তৈরি হওয়া, ভ্যালুজ হারিয়ে নতুন নীতিকে আঁকড়ে ধরার অস্বস্তি, অসুখী স্বামী-স্ত্রী, অযোগ্য বাবা-মায়েদের যোগফল ‘আমি আসবো ফিরে’।

ছবিঃ অঞ্জন দত্তের নতুন ছবি ‘আমি আসবো ফিরে’-এর একটি দৃশ্য

গৈরিক সরকারের ক্যামেরা। আলো-আঁধার মেশানো কুয়াশার মধ্যে চরিত্রগুলোকে ধরেছে চরিত্রেরই অন্তর্লীন আবছায়ার মতো করেই। অঞ্জন দত্ত শুরু থেকেই বলে আসছেন, তিনি তাঁর চেনাজানা পরিবেশের বাইরে গিয়ে ছবি করবেন না, সেটা মিথ্যাচার হবে। কিন্তু সত্যের প্রতি অনুগত থাকতে গিয়ে নিজেকে রিপিট করছেন না তো? সেটাও তো ভাবতে হবে। আগেই তিনি বলেছিলেন, গান দিয়েও মানুষের মনের পরিবর্তন ঘটানো যায়- সেটাই বলবো এই ছবিতে। বলেছেনও। বব মার্লের উদ্ধৃতি দিয়ে নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার চেষ্টাও করেছেন।

‘আমি আসবো ফিরে’ ছবিতে গান আছে ছ’টি। তবে মন বদলানোর গান দুটি। ‘চলে যেতে গেলে কিছুটা ভুলে যেতে হবে’ আর ‘একা একা রাস্তায় হাঁটা’। দুটিই একান্তভাবে অঞ্জনময়। সুরে তো বটেই, কথার মধ্যেও বিষাদ এবং আশা-স্বপ্নের জালা বোনা। একা একফালি রোদ্দুর বারান্দায়, কার্নিশে, একা একা শ্মশান যাওয়ার কথাগুলো সত্যি অশান্ত মনকে শান্ত করে দেয় এক দুর্নিবার বেদনায়।

গানই এই ছবির মেরুদণ্ড। এই গানগুলি শুনেই রণজয়ের (অঞ্জন) অসুস্থ শাশুড়ি মা কদিনের জন্য সুস্থ হয়ে ওঠেন, ধর্ষিতা রঞ্জনা (দর্শনা) অভিমান-রাগ-হতাশা সরিয়ে নতুন জীবনের মুখোমুখি হয়। ধর্ষণের মামলার উকিল গার্গীর (স্বস্তিকা) তরুণী মেয়ে (সৌরসেনী) বাবার বয়সী প্রেমিক জোজোর (কৌশিক) সঙ্গে ঘর বাঁধে, সুখীও হয়। রণজয়ের লেখা গানগুলি ওঁরই বাড়ির ভাড়াটে তরুণ ব্যান্ডশিল্পী অর্ক (অনিন্দ্য) রেকর্ড করে দেয় বাড়িভাড়া মকুব করার অজুহাতে। আর সেই রেকর্ড করা গান বেশ কৌশলে ও মজা করেই পরিচালক অঞ্জন দত্ত চরিত্রগুলোর কাছে ছড়িয়ে দেন। কেউ জানে না কার গান কে গাইছে। তার এই পরিকল্পনাটি ভাল। একেবারে শেষে দর্শককে জানানো হয়, গানগুলির প্রকৃত গীতিকার রণজয়ের ধর্ষক সন্তান সঞ্জু, যাঁকে একটিবারের জন্যও দেখানো হয় না। দুর্দান্ত সিনেমাটির ভাবনা।

এমন কিছু উজ্জ্বল মুহূর্ত ছবির নানা জায়গায় ছড়ানো। তবে সবগুলি দৃশ্যের উপস্থাপনায় রয়েছে অঞ্জনীয় বেঞ্চমার্ক। নীল দত্তের সুরে গানগুলোয় জাদু না থাকলেও মন ভারী করা এলিমেন্ট রয়েছে।

পুরো ছবিটাই অবশ্য ডার্ক। দৈনন্দিন জীবনের অন্ধকার দিকগুলোই ধরেছেন পরিচালক। তবে শেষপর্যন্ত গানের মাধ্যমে যে গোলগাল সুখসমাপ্তি সেটা একটু দীর্ঘায়িত এবং ক্লিশেই বলব। যা অঞ্জন দত্তের কাছ থেকে আশা করি না। আবার এই অঞ্জন দত্তই রণজয়কে নিরুদ্দেশে পাঠিয়ে দিলেন। কেন? তাঁরই গান ‘রঞ্জনা আমি আর আসবো না’র বিপরীতে এবার তিনি গাইলেন ‘আমি ফিরে আসবো তোমার পাড়ায়/ রঞ্জনা তুমি দাঁড়িয়ে থেকো তোমার বারান্দায়।’ ঠ্যাং খোঁড়া করে দেওয়ার ভয়ে প্রেমিকা আর পালিয়ে যাবে না অর্থাৎ ফিরে আসার অন্য এক গল্প আবার পাওয়া যাবে তাঁর কলম ও ক্যামেরা থেকে।

Comments

comments