ডাঃ এম, এস আকবর ও নৌকার জয়গান

0

কৌশিক মাহমুদ||

প্রয়াত আলহাজ্ব প্রফেসর ডাঃ মোহাম্মদ সিরাজুল আকবর (এমপি) ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ইং ০৯মার্চ পর্যন্ত পরপর চারবার মাগুরা-০১ (শ্রীপুর ও মাগুরা সদর) আসন থেকে নির্বাচিত ও অপরাজিত সংসদ সদস্য ছিলেন। মাগুরা জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সফল সাধারন সম্পাদক ৮ মার্চ ২০০১৫ ইং তারিখে জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি নির্বাচিত হয়, ঠিক তার পরের দিন (০৯মার্চ ) মাগুরা থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে মৃত্যুবরন করেন।

উল্লেখ্য ৯১-মাগুরা-০১ সংসদীয় আসন থেকে ডাঃ মোহাম্মদ সিরাজুল আকবরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা ছিল এরকম : ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মননয়ন প্রাপ্ত সাবেক বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ১৯৯৪ সালের মাগুরা০২ আসনের উপ-নির্বাচনসহ, তৎকালীন মাগুরায় অসংখ্য দুঃশাসনের প্রধান হোতা মেঃজেঃ এম মজিদ উল হককে পরাজিত করে প্রথমবারের মত বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাগুরা ১ আসনের জগদ্দল পাথরকে সারাতে সক্ষম হন।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চার দলীয় জোট থেকে মননয়ন প্রাপ্ত সাবেক স্বৈরাচারি এরশাদ সরকারের আর এক প্রভাবশালী মন্ত্রী বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, এ্যাড. নিতাই রায় চৌধুরী (বিএনপি)কে পরাজিত করেছিলেন ডাঃ এম এস আকবর যা কিনা ধারাবাহিকতার সিঁড়িতে ২য় বারের মত বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের হয়ে জাতীয় সংসদ এর পথে পুনঃ হেটে চলা ।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মননয়ন প্রাপ্ত পাকিস্তান সরকারে ডের্পুটি স্পীকার মুসলিমলীগার মরহুম মশিউল আয্মের পুত্র ইকবাল আকতার খান কাফুর এর (বিএনপি)কে পরাজিত করে হ্যাট্রিক জয়ে নৌকা প্রতিকে ৩য় বারের মত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হয়ে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ভোট এর যুদ্ধজয় করে।

সর্বশেষ ২০১৪সালের ৫ই জানুয়ারী গনতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে, শ্রীপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি,মুক্তিযুদ্ধে শ্রীপুর আকবর বাহীনির প্রধান, মরহুম মুক্তিযোদ্ধা আকরব হোসেন মিয়ার পুত্র কুতুবুল্লাহ হোসেন কুটি মিয়া কে পরাজিত করেছিলেন ডাঃএমএস আকবর ৪র্থ ও শেষবারের মত মাগুরা-১আসনকে আগলে রেখে টানা চার বারের জাতীয় সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত। তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থান যেমন আওয়ামীলীগের ক্রান্তী লগ্নে তেমনি জীবনের শেষ মহুর্ত পর্যন্ত দায়িত্বে কর্মরত থেকেই এ পৃথিবি ত্যাগ করেছেন। আমি শুধু তার জীবনের শেষদিনটার স্মৃতিচারন করতে চাই।

আগের দিন ৮ই মার্চ ২০১৫ মাগুরা জেলা আওয়ামীগের সম্মেলন সকাল ৮টার দিকে তার ব্যবহৃত ক্যমেরাটি আমার হাতে দিয়ে বললেন- এটাকে চার্জে লাগাও এবং ক্যামেরা দিয়ে আমার সমস্ত জায়গার ছবি গুলো তুলবে। সেসময় জাতীয় নেতৃবৃন্দ মাগুরায় উপস্থিত হলেন। জাতীয় পতাকা উত্তলোন ও জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে প্রথম অধিবেশনের কাজ শুরু হল। বক্তারা মঞ্চে বক্তব্য রাখছেন। প্রচন্ড রোদে স্যারের মুখখানী কালো হয়ে গেছে এবং তার মুখে স্পষ্ট অস্বস্থির প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। কিছুক্ষনের মধ্যে দাঁড়িয়ে ইশারায় আমাকে ছাড়াও কিছু মানুষকে ডাকলেন। আমরা বুঝতে পেরেই মঞ্চ থেকে নামিয়ে মাগুরা শিল্পকলা একাডেমীর নিচতলায় ফ্যান ছেড়ে বিশ্রামের ব্যবস্থা করলাম। তারপর ডাকা হল ডাঃ দেবাশিষ বিশ্বাসকে। তিনি এসে প্রাথমিক দেখার পর বাসায় নিয়ে যেতে বললেন। বিশ্রামের জন্য ড্রাইভারকে ডেকে গাড়ীতে করে বাসায় নিয়ে যাওয়া হল। ইতিমধ্যে ডাঃ দেবাশিষসহ একটি টিম আমাদের সাথেই অবস্থান করছেন ,তারপর আমি মটর সাইকেল যোগে ঔষুধ ও ডাঃ তৌহিদুল আলম সাহেব কে নিয়ে আসলাম। যথারিতি ডাক্তার সাহেব স্বাস্হ্য পরিক্ষা করে শরীরে সেলাইন ও অন্যান্য চিকিৎসা প্রদান করছেন। ঘন্টা দুয়েক পর তিনি একটু সুস্থবোধ করলেন।

বেলা ৩টার দিকে তৎকালীন হাজরাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক আঃ মান্নান ভাই ও আমাকে স্যার ডাকলেন। বললেন- তোমাদের অনেক কাজ,আমার সাথে বসে লান্স করে নাও। স্যারের অনুরোধে আমরা এক সাথেই দুপুরের খাওয়া শেষ করে নিলাম। মান্নান ভাই ও এ্যাড শাহিন ভায়ের নেতৃত্বে সহযোগী আমি আগের রাতেই সম্মেলনের ডেলিগেট ও কাউন্সিলর তালিকা ও কার্ড প্রস্তুত করার দায়িত্বে ছিলাম। আমাদেরকে বললেন- তোমরা অডিটোরিয়ামে চলে যাও। এগুলো বিতরনের ব্যবস্থা কর চারটার সময় ২য় অধিবেশন শুরু হবে। আমি আর মান্নান ভাই চলে গেলাম অডিটরিয়ামে। কার্ড বিতরন শেষ করলাম। কিছুক্ষন পর অথিতিসহ স্যার সার্কিট হাউজ হয়ে অডিটোরিয়ামে আসলেন। যথারিতি জাতীয় নেতৃবৃন্দ ঘোষণা দিলেন ডাঃ সিরাজুল আকবর সাবেক সাধারন সম্পাদক কে মাগুরা জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক হিসেবে মাগুরা সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বাবু পংকজ কুন্ডুর নাম।

২য় অধিবেশন শেষ হল স্যার অসুস্থ বলে বেশি একটা সৌজন্যতার সুযোগ নাদিয়েই বাসায় নিয়ে যাওয়া হল। তারপর থেকে শুরু হল মানুষের শুভেচ্ছার ভিড় ,আমি নিজেও দুতিন দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়েগেছি। সবাই ফুল আর মিষ্টি ও সাথে ছবি নেওয়ার জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে স্যারও তাদের যথারীতি সৌজন্যতা আন্তরিকতার সাথে দেখা করছেন। একের পর এক মানুষ আসছে ফুল আর মিষ্টি নিয়ে।বিশেষ করে সাধারন নেতাকর্মির মনে ও সাধারন মানুষের মনে স্পষ্ট আনন্দের জোয়ার দেখতে পেলাম। সবাই ছবি তুলছে। হঠাৎ তিনি আমাকে বললেন – সবাই ছবি তুলছে, তুইএকটা ছবি তুললি না তো? আমি বললাম আমি তো আছি, আগে দুর থেকে আসা মানুষগুলো বিদায় নিয়ে যাক, তারপর তুলব। বিশ্বাস করুন, স্যার কখনও ঐদিনের মত অান্তরিকতা আর সৌজন্যতা আমার সাথে দেখাননি। যখন ১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে তার সমস্ত অর্থ খরচ ও একা সমস্ত দাপ্তরিক দায়িত্ব, হলফ নামা, নির্বাচনি ফরম পুরনসহ, রির্টানিং অফিস ও কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগে বিভিন্ন পত্র প্রস্তুত, প্রচার, পলিং এজেন্ট নিয়োগ, যোগাযোগ, পোষ্টার প্রস্তুত বিতরন, নির্বাচন পরবর্তী রির্টান প্রস্তুত ও প্রতিদ্বন্দি প্রার্থীর মামলা, মাইকিং প্রতিটি ইউপিতে পৌছানো, মনিটরিংসহ পেমেন্ট, শ্রীপুর মাগুরা প্রতিটা কেন্দ্রে নির্বাচনি খরচ পৌছানোসহ যাবতিয় কাজ একা সাফল্যের সাথে সম্পাদন করেছি ও হিসাব রেখেছি। অারও একটু উল্লেখ করতে চাই ঐ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি চ্যালেন্সিং নির্বাচন ছিল তাঁর জীবনের। কারন শ্রীপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকসহ মাগুরা জেলা আওয়ামীলীগের বেশকিছু নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থির পক্ষে সরাসরি স্যারের বা নৌকা প্রতীকের বিরোধিতা করে কাজ করতে ছিলেন। তারপরও স্যারকে একবিন্দু ভেঙ্গে পড়তে দেখি নি। দিনরাত এক করে মাঠ গোছানোর কাজে ব্যাস্ত থেকেছেন। তার আস্থা তৃন্যমুল আওয়ামীলীগ তথা ইউনিয়ন ও ওর্য়াড পর্যায়ে আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ ও সাধারন মানুষ,অবশ্য তারাও ভালবাসা ও উপকারের মর্যাদাদিয়ে ঐ নির্বাচনে স্যারকে নির্বাচিত করেছেন।

ঐ নির্বাচনে বিজয়ের পরও অামার প্রতি এইরকম অান্তরিকতা ও সৌজন্যতা দেখান নি,যাইহোক রাত ১১টা স্যার বেডরুমে চলে গেলেন। আমি বিদায় নিব বাড়ী যাওয়ার জন্যে। কারন খুব ক্লান্ত। আগের রাতে তেমন একটা ঘুম হয়নি। স্যারের ক্যামেরাটা দিয়ে বললাম- আমি বাড়ি যাচ্ছি। উনি বললেন- কি ছবি তুলেছিস দেখা,আমি ছবি দেখালাম, উনি রাতে আর কিছু খেলেন না। দেশি কলা খাচ্ছিলেন আর ছবি দেখছিলেন আর মন্তব্য করছিলেন, আমি নিজেই বললাম আপনি অসুস্থ আজ ঘুমিয়ে পড়েন, আমি বাড়ী চলে গেলাম। সকালে শরীর খারাপ বলে স্যারের কোথাও যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল না। সকাল ১১টার দিকে উনার বাসায় আসলাম। এসে শুনি উনি শ্রীপুরে দাওয়াত খেতে চলে গিয়েছেন।  তারপর দুইটার দিকে শ্রীপুর থেকে বাসায় ফিরলেন। দুপুরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিবেন। এসে যোহরের নাম আদায় করে সিড়ি দিয়ে একসাথে নামতে নামতে আমাকে বললেন।  তুই কাল ঢাকায় চলে অায়। আমি বললাম ঠিক আছে স্যার।গাড়ীর ডালা খোলা হল। সামনে সিটে বসবেন বলে। এই সময় উনি বললেন খামারপাড়া মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে দৈ আনার জন্যে। টাকাও বের করলেন,পাশ থেকে কে যেন বললেন যাওয়ার পথে বাগাট থেকে নিয়ে যাবেন। আর দেরি করার দরকার নেই। তারপর আবার গাড়ীর ডালা খোলা হল সিটে বসবেন বলে হঠাৎ করে একজন রোগী রিক্সা নিয়ে আসলেন। উনার চোখে পড়েগেল। গাড়ীতে না উঠে বাইরের ঘরে টেবিলে বসে রুগি বাচ্চাটি দেখে দিলেন। রুগির পিতামাতাও খুব খুশি হলেন।

তারপর স্যার গাড়ীতে উঠলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আমরা উনার বাসায় বসেই বাংলাদেশ ইংলান্ড বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা দেখলাম আনন্দ করলাম। বাংলাদেশ জিতল, জয়ের আনন্দ নিয়ে বাড়িতে পৌছালাম।পায়ের জুতা একটা খুলতে না খুলতেই একটা ফোন আসল হাজীপুরের টোকন, উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ন আহবায়ক, আমার ছাত্রলীগের সহ যোদ্ধা বলল দোস্ত এমপি সাহেব নাকি মারা গেছেন?

ওর ফোন রাখতে না রাখতেই একের পর এক ফোন আসা শুরু হল, নিশ্চিত হলাম স্যার আর নেই। একটি ফোনেই সমস্ত স্বপ্ন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। স্যারের আর ১২৭দারুস সালাম পৌছান হয়নি। আমিন বাজার থেকেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। জুতা খানা পরে আবার চলে আসলাম মাগুরা শহরে।  মাগুরা পৌরসভার বর্তমান মেয়র খুরশিদ হায়দার টুটুল ভাইয়ের স্ত্রী,হাসিদি,আমি,মাগুরা মোল্যাপাড়া থেকে,মাগুরা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, সাধারন সম্পাদক ও মাগুরা জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক উপ-প্রচার সম্পাদক এ্যাড. শাখারুল ইসলাম শাকিল ভাইকে নিয়ে  আলোকদিয়া থেকে মাগুরা জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ শরিফুল ইসলাম দাদাকে সাথে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা হলাম। পরেরদিন ১০মার্চ ভোর বেলা ঢাকা সোরহয়ার্দী মেডিকেলে পৌছালাম। দেখলাম হিমঘরে স্যারের নিথর দেহ খানা ফ্রীজিং করে রেখেছে।

আমি স্যারের কথা মত ঢাকা ঠিকই পৌছালাম কিন্তু দেখলাম তার নিথর ফ্রিজিং দেহ খানা “লাশ”,কেন আসতে বলেছিল তা আর জানা  হল না। এখনও আমার আক্ষেপ হয় নিজের কাছে নিজেকে লেট মনে হয়। কেন ছবিটা তুললাম না। এই ভাবেই আমার ভাগ্য আমাকে সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে দেয়নি। আজ স্যার নেই, যা আছে তা শুধুই স্মৃতি। আল্লাহ স্যারকে বেহেশতের সর্বচ্চ স্থান দান করুন ।

Comments

comments