নেপাল বিমান দুর্ঘটনা; আমার মৃত্যু কোথায়?

0

রাইজিং ডেস্ক||ফেসবুক

ফেসবুকে জনপ্রিয় লেখক। আসলে শুধু ফেসবুক বললে ভূল হবে। কারণ উনার এখন পর্যন্ত ২-৩টা বই বেড়িয়েছে যা বাংলাদেশের অনেক মস্তবড় লেখকদের থেকেও বেশি সুনাম কুড়িয়েছে এবং বিক্রির দিক থেকেও বেশ এগিয়ে। ফেসবুকে মৃত্যু নিয়ে লেখা এই লেখকের অসাধারণ একটি লেখা পাঠকদের উদ্দেশে হুবুহু তুলে দিলাম।

নেপালে বিমান দূর্ঘটনার কথাই ধরুন। একদম সুস্থ-সবল, ফুরফুরে শরীর নিয়ে কিছু মানুষ যাত্রা করেছিলো। এরপর কি হলো? একটি মাত্র দূর্ঘটনা। যাত্রীদের জীবনের সকল চিত্র মূহুর্তে পাল্টে গেলো। সকালবেলা বিমানে উঠার আগে চেক ইন দেওয়া ছেলেটার ফেইসবুক একাউন্ট এখনো আগের মতোই আছে, কিন্তু ছেলেটা আর নেই। পাসওয়ার্ড, ইমেইল- সবকিছুই রয়ে গেছে আগের মতোই। কিন্তু ব্যক্তিটা আজ ‘অতীত’।

বাসায় স্ত্রী আর সন্তানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসা লোকটা কি বিমানে উঠার আগ পর্যন্তও জানতো যে সে আর কোনদিন তার স্ত্রী-সন্তানকে দেখবে না? জানতো না।
সেই বিমানের কেউ কেউ হয়তো পরবর্তী দিনের কর্মপরিকল্পনাও ঠিক করে রেখেছিলো। কোথায় কোথায় যাবে, ঘুরবে, কি কি খাবে, কিনবে ইত্যাদি। তার সেই কর্মপরিকল্পনা কল্পনাতেই রয়ে গেছে। বাস্তব হতে পেরেছে কী? পারেনি।

খেয়াল করে দেখুন, গতবছর রামাদানে সিয়াম রেখেছে, ঈদের শপিং করেছে, বাজারে জিনিসপত্র দরদাম করেছে, রিক্সার ভাড়া নিয়ে বাড়াবাড়ি করে একপর্যায়ে রিক্সাওয়ালাকে চড় মেরে বসেছিলো এমন কতো লোকও আজ অতীত। অন্ধকার কবরে চলে গেছে, তাইনা? কেউ রোড একসিডেন্টে, কেউ বিমান দূর্ঘটনায়, কেউ জাহাজডুবিতে, কেউবা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে।

জীবনের চূড়ান্ত একটা পরিণতির নাম হলো ‘মৃত্যু’। এটা এমন একটা বাস্তবতা, পৃথিবীর কেউ এটা থেকে বাঁচতে পারবেনা। সে আস্তিক হোক বা নাস্তিক, ধার্মিক হোক বা অধার্মিক। প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আজ নয়তো আগামীকাল।

(২)

এবার একটু নিজেকে নিয়ে ভাবি। আজ পুরোদিনে কতোবার আমি মৃত্যুর কথা স্মরণ করেছি? আচ্ছা, আমি যে রামাদান অবধি বাঁচবো তার কি কোন গ্যারান্টি আছে? গ্যারান্টি যে নেই সেটা আমি খুব ভালোভাবেই জানি। অফিসে আসার পথে গাড়ি একসিডেন্টে যে আমার মৃত্যু ঘটবেনা, তার কি নিশ্চয়তা? অথবা, হঠাৎ প্রচন্ড বুকের ব্যথায় যে আমি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বো না, সেটারও কি নিশ্চয়তা আছে? নেই। যদি এর কোনটা আমার সাথে ঘটে যায়, তাহলে ঠিক কি নিয়ে আমি আমার রবের সামনে দাঁড়াবো?

বিশ্বাস করুন, আমার মৃত্যুর পরে পৃথিবীর কিচ্ছু হবে না। সূর্য উঠবে আগের মতোই। অস্ত যাবে। রজনীগন্ধাও ফুটবে। পাখির কলকাকলি, নদীর কলতান কিংবা বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, কোনটাই আমার মৃত্যুতে থেমে যাবে না। আমার মৃত্যুতে কেবল আমি, হ্যাঁ, এই আমিই ‘নাই’ হয়ে যাবো।
জানেন, আমার একগাঁদা সার্টিফিকেট আছে। দুনিয়াবি সার্টিফিকেট। পৃথিবীতে ভালোভাবে মাথা গুঁজার মতো আমার একটা জায়গা আছে। মা আছে, বাবা আছে, ভাই-বোন আছে, আরো আছে এত্তোগুলো ভালো বন্ধু, শুভাকাঙ্খী। কিন্তু যেই মূহুর্তে আমার মৃত্যু হবে, এর সবটাই পৃথিবীতে রয়ে যাবে। আমার টাকা-পয়সা, আমার ঘরবাড়ি, চাকরি, আমার সার্টিফিকেট সবকিছুই আগের মতো রয়ে যাবে। আমাকে যখন মাটির নিচে দাফন করে আসা হবে, এর কোনটাই আমার সাথে থাকবে না। আমার আলমারি ভর্তি সার্টিফিকেট, আমার ব্যাংক ভর্তি টাকা কিংবা ফেইসবুক ভর্তি বন্ধু, ফলোয়ার, খ্যাতি- সবটাই।

(৩)

আচ্ছা, যদি আজকে কোনভাবে আমি জানতে পারি যে ঠিক একবছর পরে আমার মৃত্যু হবে, আমার তখন কি করা উচিত? আমি নিশ্চিত, কেউ যদি তার মৃত্যুক্ষণ নির্দিষ্ট করে আগে থেকে জেনে যায়, তাহলে সে আর একবিন্দুও পাপ করতে পারবে না। সে সারাক্ষণ তটস্থ থাকবে মৃত্যু ভয়ে। তার পাপগুলো বারবার তার সামনে ভেসে উঠবে। জীবনে কতোবার মানুষ ঠকিয়েছে, কার কার হক্ব নষ্ট করেছে, কতো হাজারবার মিথ্যে কথা বলেছে, কতোবার ভার্চুয়ালের নিষিদ্ধ সাইটে ঢুঁ মেরেছে, কতো হাজার ওয়াক্ত সে সালাত মিস করেছে। বিশ্বাস করুন, সে যদি নিশ্চিতভাবেই জেনে যায় যে অমুক দিন বা অমুক বছর তার মৃত্যু হবে, তাহলে জীবনের প্রতিটা সেকেন্ড সে এমনভাবে পার করতো যেন এগুলো একেকটা হীরক খন্ডের মতো। একটু মিস হলে, একটু গাফেল হলেই সর্বনাশ!

আমরা হয়তো আমাদের মৃত্যুর দিনক্ষণ জানি না বা জানতে পারিনা, তবে এটুকু জানি যে- আমাকে অবশ্যই অবশ্যই মরতে হবে। এইটা জেনেও আমরা দুনিয়ামুখী হয়ে পড়ি। আখেরাত থেকে বিমুখ হয়ে যাই। আমরা এমনভাবে দিন কাটাই যেন আমি কোনদিন মরবো না। এমনভাবে যৌবন পার করি, যেন আমি কোনদিন বৃদ্ধ হবো না। এমনভাবে ধন সম্পদের বড়াই করি, যেন আমি কোনদিন আর গরীব হবো না। কি একটা মরীচিকার পেছনেই না ছুটছি, হায়!

কোরআনুল কারীমে সময়ের শপথ করে বলা হয়েছে,- ‘নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত’ [আল আসর-০২]।
আসলেই তো, আমি তো আগাগোড়া ক্ষতির মধ্যে ডুবে আছি। আমি ভেবে বসে আছি আমি খুব সহজেই মরবো না। আমি ভাবছি, আমার বয়স তো এখন পঁচিশ চলে, ষাট বছরের আগে তো মারা যাওয়ার পসিবিলিটি খুব কম। থাক, যা পাপ করার, দুনিয়াকে যা উপভোগ করার এখন করে নিই। চল্লিশে পা দিলেই নাহয় তাওবা করে নেবো, হজ্ব করে পরিশুদ্ধ হবো, মসজিদ ধরবো। হায়! শয়তান কি বিভ্রান্তই না আমাকে করে রেখেছে।
রাসূল (সাঃ) বলেছেন, আল্লাহর দেওয়া সেরা দুইটা নিয়ামতের ব্যাপারে আমরা খুব গাফিল। একটা হচ্ছে সময়, আর অন্যটা হচ্ছে স্বাস্থ্য। এই হাদীসটা নিয়ে একবার ভাবুন। আমরা কি আমাদের সময়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছি না নিজেদের স্বাস্থ্যকে? যৌবনকাল হলো ইবাদাতের জন্য বসন্তকাল। এই যৌবন কিভাবে কাটাচ্ছি? প্রেম করে, নেশা করে, আড্ডা দিয়ে, তাই নয় কি?

(৪)

খাটিয়ায় করে আমাকে কবরস্থানে নিয়ে আসা হলো। হায়! গতকালকেও তো আমি দিব্যি হাসছিলাম, কথা বলছিলাম, খাচ্ছিলাম, চ্যাট করছিলাম। আর আজ? আমি লম্বালম্বি হয়ে শুয়ে আছি। একটুপরে আমাকে মাটি চাপা দেওয়া হবে। নিজেকে নিয়ে আমার সে কি গর্ব ছিলো! পেশির বলে আমি তো আশপাশের মানুষগুলোকে মানুষই জ্ঞান করতাম না। হায়! আজকে, এই খাটিয়ায় কেমন নির্জীব হয়ে শুয়ে আছি। যে বিশালকার শরীর নিয়ে আমি অহংকার করতাম, সেটা আজ একেবারে নিথর হয়ে আছে। হায়! কতোই না ভঙ্গুর আমার অহংকার!

আমার দুনিয়া পেছনে পড়ে আছে। আমার ধন, আমার ঐশ্বর্য, আমার খ্যাতি, আমার পরিবার,আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব সবাই দুনিয়াতে। আমি একাই অনন্তকালের পথে পাড়ি জমিয়েছি।
আমার থাকা না থাকাতে দুনিয়ার কিচ্ছু যায় আসে না। আমার অনুপস্থিতি দুনিয়ার কোন পটভূমি পরিবর্তন করেনা। আমার না থাকা মানে একান্তই আমার না থাকা। আমার চলে যাওয়া মানে একান্তই আমার চলে যাওয়া। দুনিয়ায় আমার পদচিহ্ন না পড়লে পৃথিবীবাসীর কিছুই যায় আসেনা। এতে কারো কোন ক্ষতি হয় না, লাভও না। মাঝখান থেকে আমিই কেবল চলে যাই। পাড়ি জমাই এক অনন্তের পথে…

‘যেদিন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’/ আরিফ আজাদ

 

Comments

comments