পুতুল নাচ

0

পুতুল নাচ || ঐশ্বর্য অয়ন

 

মা  ডাকলেন,’  এই সজীব শুনছিস?’

‘জ্বি মা শুনছি।’

‘পড়ছিস বুঝি?’

‘হু।’

‘একটু বাইরে আয় তো বাবা।কথা আছে।’

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।মা আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,’তোর দুলাভাই যে এসেছে খোকা।এখন কি করি বল তো।’ বলেই তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

মার অস্বস্তির কারণটা আমি বুঝেছি।এই বাড়িতে শোয়ার খাট দুটা।একটাতে থাকেন বাবা। আর একটাতে অতি কষ্টে মা আর আমি থাকি।আপু আর  দুলাভাই আসলেই তাই ঘুমানোর জায়গার সংকট দেখা দেয়।আজও তাই হয়েছে। মা  গলাটা একটু নিচু করে বললেন, ‘তুই না হয় এই কয়েকটা দিন তোর বাবার সাথে….. ‘

‘আমি পারব না মা।’

‘কেন পারবি না?’

কেন পারব না?  মা সেটা ভাল করেই জানেন।  কদিন পর অনার্স শেষ হবে, মাস্টার্সে উঠব। এতদিনে বড় হয়েছি নিশ্চয়ই! এই বয়সে বাপের সাথে এক বিছানায় থাকতে তাই আমার অসহ্য লাগে। অথচ বাড়িতে কোন অতিথি আসলে হরহামেশাই আমাকে এ পরিস্থিতে পড়তে হয়।তার উপর কয়েকদিন পর ফাইনাল পরীক্ষা।পড়াশোনার দরকার আছে।কাজেই  পুনর্বার  মার প্রশ্নটার   উত্তর না দিয়ে কেটে পড়লাম।

ঘর থেকে বের হয়ে নগেন কাকার দোকান গেলাম। দোকান থেকে  একটা টোস আর এক গ্লাস পানি খেয়ে আবার বাড়ি ফিরলাম।ঘরে গিয়ে দেখি আপু আর দুলাভাই দু জনেই একে অপরকে কাতুকুতু দিচ্ছে।

আমাকে দেখে আপু বলল,’কেমন আছিস রে সজীব? খোঁজখবর তো নিসই না আমাদের।’

‘ভালোই আছি আপু।তুই কেমন আছিস?’

‘হুম ভাল।তা তোর চাকরি বাকরির কিছু হল? আর কতদিন?’

আমি চুপ করে রইলাম।এখনো তো   লেখাপড়া শেষ হল না, তাতেই মানুষের মুখে বারবার এই প্রশ্নটা  শুনতে শুনতে আমার কান  একরকম ঝালাপাড়াই হয়ে গেছে।

দুলাভাই আমার সামনেই আপুর একটা গাল টিপে দিয়ে বললেন,’  অযথা ওর চাকরি করার দরকার কিসের? আমি ওকে চাকরি দেব।’

আপু লজ্জায় লাল হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।দুলাভাই বললেন,’ সজীব আমার সাথে একটু বাইরে যেতে পারবি?’

‘কোথায়?’

‘কোথায় আবার? মেলায় যাব।’

‘মেলায় কেন?’

‘ছেলেপেলে সব মেলায়  কেন যায় রে গাধা?’ তিনি প্রথমে বিরক্ত হলেন আমার প্রশ্ন শুনে। পরে শান্ত হয়ে বললেন, ‘পুতুলনাচ দেখতে যাব।তুই  তাড়াতাড়ি তৈরি  হ।’

‘আমার পরীক্ষা দুলাভাই। ইচ্ছে থাকলেও তাই যেতে পারছি না।’

তিনি বিরসমুখে আমার দিকে তাকালেন।তারপর দাঁত কিড়মিড়  করে মেলার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।

পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙল  চিৎকার চেঁচামেচি আর আহাজারি শুনে।বাড়ির উঠোনের খড়ের গাদাটাতে ঘুমিয়ে ছিলাম।ঘুম ভাঙলে কোনমতে চোখ মুখ ঘষে  কলের পাড়ে গিয়ে ছাই  দিয়ে দাঁত  মাজতে লাগলাম।দেখলাম মা ওখানে কাঁদছেন আর বাবাকে অভিশাপ দিচ্ছেন। তার সারা গায়ে ভাত সবজি লেপ্টে আছে।অদূরে  কড়াই আর  ভাতের ডেকচিটা পড়ে থাকতে দেখা গেল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,’ কি হয়েছে মা?’

মা আমার দিকে তাকালেন।কিন্তু কিছু বললেন না।উল্টো  গলা ছেড়ে দিয়ে কাঁদতে লাগলেন।আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।মা সংক্ষেপে যা বললেন তা হল গড়ের হাটে যে মেলা বসেছে সেখানে জুয়ার আসর জমেছে।জুয়ায় বাবা হাজার

বিশেকের মত টাকা খুইয়েছেন।পুরো টাকাই সুদের উপর নেয়া।আগের টাকাগুলো তিনি ফেরত পেতে চান।এজন্য মার সোনার বালাগুলো বিক্রি করতে হবে। আর বালা বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি আগের টাকা  ফেরত পাওয়ার মিশনে নাম্বেন।কিন্ত মা তাতে রাজি নন।তাই এই অবাধ্য মহিলাকে একটু শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন বাবা।

মার কপাল দিয়ে রক্ত ঝরছে।আমার মাথা বিগড়ে গেল।অনেক সহ্য করেছি।আর না।ওই লোকটার মুখোমুখি এবার আমাকে যে করে হোক হতেই হবে।

কিন্তু তার সামনে গিয়ে আমি বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।মুখ দিয়ে একটা টু শব্দও বের হল না।তখনই আপুর গলা শুনতে পেলাম। আপু আমার নাম ধরে ডাকছেন।কাছে গেলে  বললেন,’ আমার কাছে তিন হাজারের মত টাকা আছে।’ তারপর বালিশের নিচ থেকে ছটা পাঁচশ টাকার নোট বের  করে আমার হাতে দিয়ে বললেন,’ যা টাকাগুলো বাবাকে দিয়ে আয়।’

আমি বললাম,’ তুই টাকা পেলি কই?’

‘অযথা কথা বাড়াচ্ছিস কেন সজীব? যা বললাম তাই কর গিয়ে ।’ আপু নাক কুঁচকালেন।আমি বাবাকে  গিয়ে  টাকাগুলো দিলাম।ভদ্রলোক স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কে টাকা দিল আর কেনই বা দিল -সে ধরনের কোন প্রশ্নে তিনি গেলেন না।

একটা কাজে সদরে গিয়েছিলাম।সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে ফিরে  শুনি আবার  কে বা সারা বাড়িতে মড়াকান্না জুড়ে দিয়েছে। একটু এগোতে বুঝলাম, এ আপুর গলা।আপু গলা ছেড়ে কাঁদছে আর  তখনই দুলাভাইয়ের কর্কশ গলা শোনা যাচ্ছে,’  আমার কোন মান সম্মান নাই? আমি খোলা মাঠে পায়খানা করব? মাগী তুই কর গিয়ে….’ পরক্ষণেই ধপাধপ কয়েকটা শব্দ শোনা গেল।আপু ‘ও বাবা গো’ বলে কেঁকিয়ে উঠলেন। সাথে সাথে আবার কয়েকটা ধপাধপ।

বাড়ির ল্যাট্রিনটা ভর্তি হয়েছে বছরখানেক হল। সেটা মেরামতের কোন চিন্তা এ পরিবারের কারোর আছে বলে মনে হয় না।প্রাকৃতিক কাজকর্মগুলো তাই বাইরে  কোথাও ঝোপেঝাড়ে সারতে হয়।বাড়ির মহিলাদের তাই এ নিয়ে প্রায়  তীব্র অস্বস্তিতে পড়তে হয়।

আপুর বিয়ের হওয়ার মাস সাতেকের মত হল। এর মধ্যে দুলাভাই বহুবার আমাদের বাড়িতে এসেছেন।এ নিয়ে আগে তো তাকে কখনো উচ্চবাচ্য করতে দেখি নি।তাহলে আজ তার হঠাৎ এত লম্ফঝম্প করার কারণটা  কি? একটু ঘাটাঘাটি করার পর বুঝলাম,  ওই তিন হাজার টাকা আপু তার স্বামীর পকেট থেকে সরিয়েছেন। জিজ্ঞেস করলে বারবার অস্বীকার করেছেন।তাই কোনমতে একটা অজুহাত বের করে দুলাভাই গণ্ডগোল পাকাতে চাচ্ছেন।সেই গণ্ডগোল তিনি সারা রাতই করলেন।আর তাতে করে আমাদের সকলের ঘুমও  চোখ থেকে ছুট মারল।

দুপুরের দিকে পরাণ কাকা   মেলা থেকে ফিরে  জানালেন যে বাবাকে নাকি    পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে।এই খবর শুনে মা  একেবারে নিশ্চুপ হয়ে  দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছু বলতে পারলেন না।প্রশাসনের লোকজনকে মা  কেন জানি যমের   ভয় পান। আমার স্পষ্ট মনে আছে, একবার কালো পোশাক পড়া র্যাবকে দেখে তাঁর জ্বর পর্যন্ত এসেছিল।

কিছুক্ষন পর  মা স্বাভাবিক  হয়ে আমাকে বললেন দুলাভাই ডাকতে।আমি গেলাম তার ঘরে।তিনি হাসতে হাসতে বললেন,’ শ্বশুরকে পুলিশে যে প্যাঁদানি দিয়েছে না,  আর বলিস না।লাথি মারতে মারতে গাড়িতে তুলেছে।’  তার হাসির আমি কোন কারণ খুঁজে পেলাম না।শ্বশুরকে লাথি মারতে মারতে পুলিশ গাড়িতে তুলেছে এটা কোন হাসির কথা! তিনি তখনো খ্যাঁকখ্যাঁক করে  হেসেই চলছেন।আমি বললাম,’ মা আপনাকে ডাকছে দুলাভাই।’

‘কই ডাকছে আমায়? ‘ তার হাসি থামছেই না। আমি বললাম,’ বারান্দায় আছেন।তিনি খুব ছটফট করছেন।’

মা দেয়ালে হেলান গম্ভীর মুখে বসে আছেন।তিনি না পারছেন কাঁদতে, না পারছেন স্বাভাবিক হতে।দুলাভাই তাকে অভয় দিয়ে বলল,’ আপনি কোন চিন্তা করবেন না।আমি আছি তো।বাবা সন্ধ্যার আগে ফিরে আসবেন।’

ভদ্রলোক ঠিকই সন্ধ্যার আগে বাড়িতে ফিরলেন।

গড়ের হাটের মেলা চলে সপ্তাহখানেক।মেলা শেষ হওয়ার আগের দিন  আপু বায়না ধরে বসলেন, তিনি ‘মৃত্যুকুপ’ মোটরসাইকেল খেলা দেখতে । সবাই যায়। তিনিও তো মানুষ।তারও তো শখ আলহাদ করতে মন চায়।  নির্ধিদ্বায় স্বামীর কাছে গিয়ে বললেন সে কথা। সব শুনে দুলাভাই বললেন,’আমি পারব না।আমার কাজ আছে।’

‘কি কাজ?’

‘সেটা কি তোকে বলতে হবে।’  স্বামীর কথা আপু মুখ ভার করে রইল।দুলাভাই বলল,’  আমি এখন একটু বেরুচ্ছি।আমার আসতে আসতে  মাঝরাত হয়ে যেতে পারে।দরজায় ছিটকিনি দেয়ার দরকার নেই।তুই তো আবার  কুম্ভকর্ণ।একেবারে কাত হলেই রাত শেষ।’

দুলাভাই ফিরলেন দশটার দিকে।এসেই তিনি সারা বাড়িটা মাথায় তুললেন।মা তাঁর কাছে গিয়ে বলল,’ কি হয়েছে জামাই?’

‘কি হয় নাই সেটাই বলেন!’ দুলাভাইয়ের  কর্কশ গলা শোনা গেল,’ এই বয়সে কি ওই বুড়োর ভিমরতি ধরেছে নাকি?’

‘পুরোটা না বললে কি করে বুঝব বাবা…..’

‘ আপনার সামনে আমি ওসব কথা বলতে পারব না।সজীবকে বলছি।ওর কাছ থেকে শুনে নিয়েন।’

দুলাভাই আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলেন।উঠোনের পিছনে যে বিশাল সবজি খেত তাঁর সামনে গিয়ে মাথা চাপড়াতে লাগলেন। আমি বললাম,’ এমন করছেন কেন  দুলাভাই? কি হয়েছে আপনার?’

‘ আমার শ্বশুর……’

‘ কি করেছে বাবা?’

‘ উনি কি করে এতগুলো মানুষের সামনে একটা ছুকড়ির ব্লাউজে টাকা ঢুকিয়ে দিলেন।ছি! ছি! মুখ দেখানোর আর জায়গা রইল না।’ তিনি শব্দ করে কয়েকবার থুথু ফেললেন।তারপর কয়েকটা সিগারেট টানলেন।আমি বললাম,’ আমার বিশ্বাস হচ্ছে না । কি প্রমাণ আছে আপনার কাছে?’

‘প্রমান? তিনি তেলেবেগুলে জ্বলে উঠলেন,’ আমি নিজ চোখে দেখেছি।’

আমি বললাম,’ তাহলে আপনিও নিশ্চয় ধোঁয়া তুলসী পাতা নন।’

তিনি  গাঁজাখোরদের মত চোখ লাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সেদিন সারা রাত বাবা বাড়ি ফিরলেন না।পরেরদিন সকালের আলো ফুটতে না ফুটতে দেখি তিনি একটা আধবয়সী মহিলাকে  নিয়ে বাড়িতে উপস্থিত।মহিলার চোখে মুখে স্নো পাউডারের দাগ  লেগে আছে।।বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,’ কি রে অমন করে হা করে তাকিয়ে আছিস কেন?’

এমন সময়  মা  কোত্থেকে জানি হম্বিতম্বি করে ছুটে আসলেন।চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন ওই মহিলার দিকে।তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,’ কে ও?’

কেউ না বলে বাবা রহস্য করে হাসলেন।তারপর বললেন,ওর খুব খিদে লেগেছে।দেখ তো খাবার দাবার কিছু আছে কি না?’

মা কিছু বলতে গিয়েও বললেন না।দুপুরে খাবারের পর বাবা মার কানের কাছে গিয়ে বললেন,’ ওর থাকার একটু ব্যবস্থা কর তো।’

মা  কিছুক্ষণ নিশ্চুপ  থেকে   বললেন,’থাকার তো জায়গা নেই।’

‘কি যে বল না? জামাইরা যেখানে থাকে ওখানে একটু   ব্যবস্থা করলেই তো হয়।’

দুলাভাই  ঘুমাচ্ছিলেন। দিন দুপুরে নাক ডেকে ঘুমানোর একটা বাজে অভ্যাস আছে তার।ঘুম ভাংতেই তিনি অনেক্ষণ কাঠ হয়ে রইলেন।তারপর কিছুটা বিস্ময়  আর কিছুটা ঘৃণা মাখা  গলায় চেচিয়ে উঠলেন, এই,  এই তুই  আমার ঢুকেছিস কেন?’

যাকে উদ্দেশ করে বলা  ওসব কানে নেয় না সে। উলটো বিছানার দিকে  নিশ্চিন্তে এগিয়ে যায়।দুলাভাই বলে,’ আমার বিছানা ছুঁবি না তুই।ভাল হবে না কিন্তু বলে দিলাম।’

শেষে ওই মহিলা   ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় মরাকান্না জুড়ে দেয়। কান্নার সে কি সুর! এমন সুর করে কাঁদতে আমি আগে কাউকে দেখি নি।আশেপাশের উৎসুক  প্রতিবেশীরা  এসে  বাড়ির উঠোনে  ভিড় জমাতে শুরু করল।

বাবা তখুনি ভিতরে গিয়ে গলা চড়ালেন,’ তুমি আমার কুটুমের সাথে এরকম আচরণ করতে পার না মানিক।জামাই জামাই এর মত থাকবে।সহ্যের একটা সীমা আছে।’

দুলাভাই খাটটাতে কয়েকটা লাথি মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সেই যে গেলেন তো গেলন।এরপর আর কোনদিন তিনি আমাদের বাড়িতে পা ফেলেন নি।

Comments

comments