বাংলাদেশ ষড়যন্ত্রকারীদের চাপাতির নীচে!

0

আবদুর রহিম||

বাংলাদেশ থেকে কালো থাবার মেঘ কাটছেই না। ভেতরে বিপদ, বাহিরে বিপদ। বিপদে-বিপদে পুরো ভূমিতে পঁচন ধরছে। রাজনীতির মাঠে চলছে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ। রোহিঙ্গা নিয়ে ভূখণ্ডে চলছে নিরাপত্তার আর্তনাদ। বাংলাদেশে পদে পদে খাচ্ছে কূটনীতিক মার। দ্রব্যমূল্যর উর্ধ্বগতিতে দূর্বিসহ জনজীবন। কথায় কথায় বাড়ছে তেল-গ্যাসের দাম। তার উপর চলছে কলমের রক্তক্ষরণ। এর দায় কি পরিবেশ রক্ষাকারীরা নেবেন না? নিতেই হবে। কারণ আমার আপনার নিরাপত্তার দায় যে, তাদের হাতে…

ইস্যুতত্ত্বের কথাই বলবো। তার আগে নীরব যন্ত্রণার কিছু সমিকরণ স্মরণ করি। ২০০৯ থেকে বাংলাদেশে বহু স্পর্ষকাতর ঘটনায় এখনো দেশের সচেতন মহলে রক্তক্ষরণ চলছে। প্রতিরাতেই ঘুমানোর আগে কেউ না কেউ তা ঠিকই স্মরণ করছে, সেই ঘটনা ও নানা কেলেঙ্কারি। নীরব যন্ত্রণা ঘুমড়িয়ে মরছেন। সেই কিছু দৃশ্যপট না বললেই নয়। বিডিয়ার  বিদ্রোহে রক্তাক্ত ভূমি ও দেশের অস্তিত্ত্বে আঘাত। সাগর- রুনি হত্যা। দেশের প্রধান বিচারপতির নাটকীয় পদত্যাগ।

শেয়ার বাজার লুট, হলমার্ক কেলেংকারী, ডেসটিনি ইউনি পে-সহ বিভিন্ন এমএলম কোম্পানির লুটপাট। আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুট। ইসলামি ব্যাংক, ফার্মার্স ব্যাংক বেসিক ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ব অন্যান্য ব্যাংক লুটপাটের এখনো কুলকিনারা না হওয়া।

সীমান্তে ফেলানী হত্যা। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। সচেতনতার অভাবে পাহাড়ধ্বসে সেনাসহ ৮৯ নিহত। বহু ব্লগার হত্যাকান্ড। সুরঞ্জিতের কালো বিড়াল, পদ্মা সেতুর আবুল হোসেন এর কলঙ্কের কাহিনী। ইলিয়াস আলীসহ বহু অসংখ্য বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী গুম। নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাতখুন, তার সাথে জড়িত ছিলো প্রশাসন ও রাজনৈতিক শীর্ষ ব্যাক্তিরা। ফেনীতে উপজেলা চেয়ারম্যান, নাটোরে উপজেলা চেয়ারম্যান ও নরসিংদীতে নিজ দলীয় পৌর মেয়রকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা।  বিতর্কিত শিক্ষানীতি ও পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহোৎসব, লতিফ সিদ্দিকীর ধর্ম অবমাননা, সংখ্যালগু ও বিদেশীদের উপর পরিকল্পিত হামলা, কুমিল্লায় তনু হত্যা, বাঁশখালীতে ঝুঁকিপূর্ণ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, এসপি বাবুল স্ত্রী’র রক্তে সড়ক রঞ্জিত, গুলশান ও শোলাকিয়াসহ সিরিজ জঙ্গি হামলা, বিতর্কিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাওড়ে বাধ নির্মাণে দুর্নীতি, ঢাকার জলাবদ্ধতাতো নীরব যন্ত্রনার নাম। গণমাধ্যমে বিতর্কিত ৫৭ ধারা যার ফলে এখন হাতখুলে লিখাও দায়। এত রক্তক্ষরণের মাঝে এবার উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের টার্গেট মুক্তমতে।

যদিও বাংলাদেশ বহু আগ থেকেই সন্ত্রাসী ঝুঁকি তালিকায়। হওয়ারই কথা। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি পরিচালিত হয় তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের নিরিখে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পররাষ্ট্র নীতিও পরিচালিত হয় তাদের নিজস্ব স্বার্থে। শুধু ব্যাতিক্রম এ দেশটা। এখানে সরকারের সকল নীতি ব্যাবহার হয় বিরোধী দলকে নাজেহাল করার জন্য। এ কারণে দেশের অভ্যান্তরে চলছে আক্রোশের অগ্নিযুদ্ধ। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ঘুম, খুন, ধর্ষণে স্ব শরীরে অংশগ্রহণ করছেন। তারা কোনো এক উপরের শক্তিতে রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের ও নির্যাতন করছেন। সেখানে আমার আপনার নিরাপত্তা দেবে কে? ওই বাহিনী!

এবার গতিপথে আসি। বাংলাদেশে জঙ্গি পরিস্থির উদ্ভোব বিএনপি জোট সরকারের আমল থেকেই। তখন এলাকা ভিত্তিক কিছু জঙ্গি সংগঠনের নাম পাওয়া যায়।  সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসানের ‘যে আগুণে পুড়ছে বাংলাদেশ’ বই থেকে কিছু নাম খুঁজে পাই। তা হলো, চট্টগ্রামের জামাত-ই  ইয়াহিয়া, আল তুরাত ও হিজবুল তাওহিদ। সিলেটের আল হারাকাত আল ইসলামিয়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে আল মারকাযুল আল ইসলামি, মৌলবাজারের জামাতয়াতুল ফালাইয়া, এছাড়াও উত্তরবঙ্গের জামাতুল মুজাহিদিন, তাওহিদি জনতা, বিশ্ব ইসলামী ফ্রন্ট, জুম্মাতুল আল সাদ ও নিষিদ্ধঘোষিত শাহাতই আল হিকমা, কিশোরগঞ্জের শাহাদই নব্যুয়াত। হরকাতুল জিহাদ তখন দেশব্যাপি সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলো। তখন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে দেশের ভিবিন্নস্থানে ৪৮টি স্থানে জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম মজবুত ছিলো। একটির সাথে অন্যটির যোগসূত্র পাওয়া যেতো। যদিও সে ঘটনাকে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জঙ্গি বলতে রাজি হননি, তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই পরিস্থিতিকে ‘পবিত্র ধর্মের নামে সন্ত্রাস’ এ বলে তাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং কারো স্বার্থ হাসিলের দিকটি ইঙ্গিত করেছিলেন। দীর্ঘ বছর পর এ জঙ্গি বিস্ফোরণটা ঘটে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সময়ে।

বছর ১৫এর আগে জঙ্গি স্টাইল কিছুটা আলোকপাত করি। বিগত জোট সরকারের আমলে তখন জঙ্গি সংগঠক শাহাদাত আল হিকমার অধিনায়ক কাওসার হোসাইন রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বিবৃতি দিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা প্রত্যাহার ও খুনী আসামীদের নিঃশর্ত মুক্তি ও দাবী করেছিলেন। পুলিশ নিয়ে নজিরবিহীন কূ মন্তব্য ও করেছিলেন, পুলিশ শব্দটি নাকি পাজির প, লুইচ্ছার ল, শয়তানের শ থেকে এসেছে। তালেবান ইসলামের নেতা আওলাদ হোসেন দিলীপকে কারাগারে নেয়ার পর তার মুক্তি দাবী করে দিলীপ-ইউছুফ বাহিনী লিখেছেন, আগামী ২৫/৩/২০০৩ তারখের মধ্যে মুক্তি না দিলে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, আদালত, জেলখানায় বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে। সেই চিঠির কিছু অংশ তুলে ধরা হলো…

আগামী ২৫/৩/২০০৩ তারিখের মধ্যে আমাদের নেতাকে মুক্তি না দিলে আমরা দেশকে যুদ্ধের নগরীতে পরিণত করিব। প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বোমা, খুন, আগুণ জ্বালাইয়া দিতে দ্বিধা করিব না। যাহারা আমাদের নেতাকে মুক্ত করার জন্য সহযোগিতা করিবে তাহাদের আমরা স্বাগত জানাই। যাহারা আমাদের নেতাকে হেস্ত নেস্ত করিতেছে তাহাদের জন্য মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করা হলো। আমাদের নেতার নির্দেশে ইসলামিক জেহাদ এ তালেবান ইসলামিক শাসনতন্ত্র কায়েম করার লক্ষ্যে বিএনপিকে উৎখাৎ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সব সময় এ জঙ্গি ইস্যুটা সন্দেহ থেকে যায় এটাকি কারো সৃষ্ট নাকি প্রেক্ষাপট গরম রাখার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৈরি?

তবে সচেতন পাঠক অবশ্য জানেন, মুক্তবুদ্ধির মাধ্যমে ভণ্ডামী রাজনীতিবিদদের মুখোশ তুলে ধরতেন কোন লেখক। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিচ্যুতির কথা বলতেন কে?

তিনি হলেন, দেশের অন্যতম প্রধান লেখক-কবি ভাষাবিজ্ঞানী ডা. হুমায়ুন আজাদ। ২০০৩ সালের বইমেলায় ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম’ তখন ক্ষমতাসীনদের অপব্যবহারের তেতো দিক গুলো কলম অস্ত্র চালিয়ে প্রতিবাদ জানায়েছিলেন তিনি। বই প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই আবার রক্তাত্ত্ব হয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অভিযাগ, উগ্রবাদিদের উপর। যদিও রাজনৈতিক হামলারও কারণ হতে পারে এটিও খুব আলোচনায় ছিলো। শুধু রাজনৈতিক অক্ষমতায় সেই বিচার না হওয়ায় বাংলাদেশে এ পর্যন্ত বহু লেখক, প্রকাশক, ভিন্ন ধর্ম, বিদেশি এবং ব্লগার হত্যার ঘটনা ঘটেছে। যেগুলোর বিচার হয়নি এখনো- ব্লগার রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ফয়সাল আরেফিন দীপন, আহমেদুর রশিদ টুটুল এ ছাড়াও ১৫ ও ১৬ সালে জঙ্গি হামলায় আরো নিহত হন অনন্ত বিজয়, ওয়াশিকুর, নামিজুদ্দিন সামাদসহ কয়েকজন ব্লগার, প্রকাশক ও লেখক। শুধু তাই নয়, যশোরে উদীসির অনুষ্ঠানে হামলা, ময়মনসিংহে বোমা হামলা, রমনার বটমূলে অসহায় নারী- শিশুর উপর হামলা, ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর হামলা, ব্লগার হত্যা প্রতিটি হত্যার সাথে রাজনৈতিক গন্ধও সম্পৃক্ত ছিলো। ক্ষমতাসীন ও রাজনৈতিক নেতারা সব সময় সব ঘটনাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

সিলেটে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন হুমকির মধ্যে থাকা ড. জাফর ইকবালের উপর সম্প্রতি হামলার ঘটনাটিও ব্যাতিক্রম নয়। যদিও বর্তমানে তিনি সজ্ঞান ও আশঙ্কামুক্ত আছেন বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ)চিকিৎসকরা। র‍্যাবের ভাষ্য, জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী হয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা চালিয়েছে ফয়জুল। তদন্তের আগেই প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন,‘হামলাকারী কারা হামলার ধরন থেকেই স্পষ্ট’। এদিকে আওয়ামী লীগের  সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জাফর ইকবালের উপর হামলা ষড়যন্ত্র। এই চক্রান্তকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে বিএনপি। কে ঘটনা ঘটিয়েছে, কারা কারা হামলাকারীকে দিয়ে ঘটনা ঘটিয়েছে—বিষয়টি ইতিমধ্যে পরিষ্কার। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, জঙ্গিরা এই খ্যাতিমান লেখককে মেরে ফেলার জন্যই এই হামলা চালিয়েছিল। তাদের পরিকল্পনা সফল হয়নি।

এদিকে এ হামলার ঘটনায় তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হামলাকারী ফয়জুর রহমানের বাবা-মাকে আটক করেছে পুলিশ। সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক লীগের নেতা হামলাকারীর মামাও আটক হয়েছেন। এই হামলার ঘটনায় সেদিনে নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকা ২ পুলিশ সদস্যও প্রত্যাহার হয়েছেন। সব মিলিয়ে কিছু ব্যাক্তি আন্তরিক থাকলে হয়তো এ ঘটনার আলোক মুখ দেখতেও পারে।

তবে মুক্তমনা এ ব্যাক্তির হামলার ঘটনার দিন বাংলাদেশে সফরত ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সিনিয়র ডিরেক্টর লিসা কার্টিস। এরপরদিন বাংলাদেশে সফরে আসেন আরো এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং।এ হামলার সাথে অন্য কোনো ইঙ্গিতও যে বহন করতে পারে তাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ধারণা রাখতে পারি, ষড়যন্ত্রকারীরা এ হামলার মাধ্যমে স্বার্থ কিংবা সরকারকে বিপদে ফেলতে ফাঁদ হিসেবেও ব্যাবহার করতে চেয়েছিলেন।

তবে নানা বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে ,আওয়ামী লীগ-বিএনপি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিকদল রাজনৈতিক সুবিধা নিতে এই জঙ্গিবাদকে নানাভাবে ব্যবহার করছেন। আর তা প্রসারের দায়িত্ব পালন করছেন বামপন্থার সঙ্গে সম্পর্কিত রয়েছেন এমন লোকজন। সত্যেই বলতে জঙ্গিবাদের অভিযোগ ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। সব ঘটনায় যদি রাজনৈতিক গন্ধ থাকে তাহলে একটি নীতি কথা বলেই শেষ করবো। ইতিহাসের শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। তবুও মনে রাখা দরকার জনপ্রিয়তা হলো বরফের মতো তা একবার গলতে শুরু করলে আর বন্ধ করা যায় না…

 

লেখক: সাংবাদিক

Comments

comments