বিলুপ্ত কিছু কথা

0

বিলুপ্ত কিছু কথা || রাহাত ভাই

সেদিন গোসল করতে যাব,
ত– আমার ছোট্ট মেয়ে তুলতুলিকে বলেছিলাম,
আম্মু যাওত  বাবার “তবন “আর গামছাটা নিয়ে আস–গোসল করব।

“তবন ” ভাষাটার সাথে সে পরিচিত ছিলনা,তাই তার মায়ের সাথে খুব হাসাহাসি করছে,আর বলছে–আব্বু লুঙ্গিকে তবন বললেন কেন?
লুঙ্গির নাম কি তবন?

মেয়ের কথা শুনে বিষয়টা আমাকে ভাবিয়ে তুলল!
আসলেইত–,
লুঙ্গি কে আমি “তবন “বললাম কেন?

প্রচলিত আঞ্চলিক ভাষায়, এই রকম আরো অনেক অনেক শব্দ আছে, যেগুলোর সাথে বর্তমান প্রজন্ম একেবারেই অপরিচিত।

তাই ভাবছি–গোসলটা সেরে এসে তুলতুলিকে আবার বলল,,
“কৌর্রা তেল “টা নিয়ে আসার জন্য।
তার পর বলব–
“আঙ্গাটা “নিয়ে আসার জন্য।

উদ্ধেস্য –পুরুনো ঐতিয্যের “লাউড়ের গড়ের “এই ভাষা গুলি তার মনে কেমন প্রভাব ফেলে।
সেটা দেখার জন্য।

যেই কথা সেই কাজ,
গোসল শেষ করে,
তুলতুলি কে ডেকে বললাম।
মা মনি— “কৌর্রা তেল আর আঙ্গা “টা নিয়ে আস।
আবারও হাসতে হাসতে ঘরে যায়, ঘরে গিয়ে, সরিষা তেলের বোতল টা নিয়ে আসে- ঠিকই।
কিন্তু— বাধ সাধল তার, আঙ্গা আনতে (শার্ট বা জামা)।
মায়ের কাছে গিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে হাসতে হাসতে বলছে।
আব্বু—আঙ্গা নিতে বলেছেন,
গিন্নি আলনা থেকে একটা শার্ট তুলতুলির হাতে তুলে দিল।
শার্টের নাম—আঙ্গা?
এটা একটা ভাষা হল?
শার্ট টা আমার হাতে দিয়ে, প্রশ্ন করল–
আব্বু তুমি শার্টকে আঙ্গা বললে কেন?

তুলতুলি যেমন– বুঝে না,
এরকম অনেক অনেক আঞ্চলিক শব্দ বা ভাষার ব্যবহার।
ঠিক তেমনি—নতুন প্রজন্মও জানেনা, আমাদের ঐতিয্যবাহী হারিয়ে যাওয়া কিছু কিছু ভাষা।

যেমন—-
ছোট ভাইকে আদর করে ডাকা হত–বান্দই।
এই বান্দই ডাক টা, আমাদের সময়ে মোটামোটি প্রচলিত ছিল–কিন্তু—
বর্তমানে আর শুনা’ই যায় না।

হাস্যকর হলেও সত্য যে–এখনো ডিমকে–বইদা বলা হয়।
এটা এখনো বউ-ঝিয়েদের মুখে কিছুটা শুনা যায়।

তবে– একদম যেটা হারিয়ে গেছে,
সেটা হল–নিমহ,মানে লবন।
কারো মুখে আর শুনি না, পুরোপুরি বিলুপ্ত ধরা যায়।
এগুলি ছাড়াও হয়ত–আরো অনেক অনেক ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে– যা আমরা কেউ জানিই  না।

আমার এক পুতি মানে (চাচা) র কথোপকথনে জানতে পেরেছিলাম,
আজকের–লাউড়ের গড়ের’ যে আঞ্চলিক ভাষা,
তার সাথে বাংলাদেশের কোথাও- কোন এলাকার ভাষার সাথে মিল নাই।
শুধুমাত্র–হবিগঞ্জ জেলার ভাষার সাথে কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া গেছে।

যাদুকাটা নদীর ঐ পাড়ে বর্তমান “বাবনগাঁও “নাকি- ছিল একসময় লাউড় রাজ্যের রাজপ্রাসাদ।
অবশ্য আমি গিয়েছিলাম দেখতে।
ধসে পড়া প্রাসাদের বড় বড় স্তম্ব আর ভাঙা চোড়া প্রাচীর গুলো আজো সাক্ষ্য বহন করে দড়িয়ে আছে।

তখকার সময় রড বিহিন ছাদ তৈরী হতো, ইট ও সুরকি মাটির প্রলেপে তৈরী হতো পাচীর,ওয়াল,ইমারত।
সত্যি আশচর্য্য লাগে,
একবার নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস’ই করা যায় না।

তাই বেশ কয়েকবার গিয়েছি–খুতিয়ে  খুতিয়ে  দেখেছি।
কিন্তু— সঠিক কোন ঐতিহাসিক ইতিহাস আজো জানতে পারিনি।
গত কদিন আগে–চাচার কাছে শুনে ছিলাম,
এই লাউড় রাজ্যের ঐতিহাসিক আংশিক ইতিহাস।

আদিবাসীদের বার বার আক্রমনের ফলেই নাকি- রাজা তার রাজপ্রাসাদ স্থানান্তর করেন হবিগঞ্জ জেলার কোন এক স্থানে।
আর সেখান থেকেই পরিচালিত হতো, শাসন কার্য্য,রাজসভার গুরু দ্বায়ীত্ব।
এভাবেি পেরিয়ে গেছে– হয়ত কয়েক শত বৎসর।
কিন্তু— আজো দাড়িয়ে আছে,মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে, কালের সাক্ষী হয়ে,
লাউড় রাজ্যের–ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ কিংবদন্তী রুপে।

এবারে আসি লাউড় রাজ্যের অন্তর্গত,  লাউড়ের গড় গ্রামের কিছু ভাষা প্রসঙ্গে।
স্থানান্তরীত সেই রাজপ্রাসাদের কারনেই কি
হবিগঞ্জের ভাষার সাথে আমাদের ভাষার কিছুটা মিল রয়ে গেল– নাকি অন্য কোন কারণে, সেটা অবশ্য জানা হয়নি।

কালের গর্ভে সব’ই হারায়, কোনটা তাড়াতাড়ি, আবার কোনটা দেরিতে,
পৃথিবীটা হারানোর জায়গা,,
তাই–প্রাচীন লাউড় রাজ্য আর বর্তমান লাউড়ের গড়ের অনেক অজানা ভাষা হয়ত আরো আগেই হারিয়ে গেছে, আর এখন কিছু হারিয়ে যাচ্ছে ধীরগতিতে।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে–কিছুকাল আগের,”লাউড়ের গড়ের”আঞ্চলিক শব্দ বা ভাষা যদি– তুলে ধরি,
হয়ত হাস্যকর শুনাবে,কিন্তু–আমাদের পূর্বপুরুষরা এই ভাষায় কথা বলতে অভস্ত্য ছিলেন।
যেমন–
লুঙ্গি মানে–তবন।
ডিম মানে–বইদা।
ভাই কে–বান্দই।
চাচা কে–পুুতি,
তরকারী কে—ছালন।
সই কে—বইনারী।
লবন কে—নিমহ।
ভাইয়ের বউ কে–কইনা বুই,
বোন কে–বুই,
কলসী–গারো,
চিরুনি–ফেইন,
ছেলে মেয়ে–ফোলাফুরি,
ঝাড়ু কে–খরখরা,উছোন,
পাখা কে–বিছুন,
—-
এই রকম অনেক অনেক ভাষা বা শব্দ আছে, যেগুলির সাথে খুবই অপরিচিত বর্তমান প্রজন্ম।

তাই তুলতুলির মনেও বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক,
অবশ্য এর একটা সুরাহা বিহিত না করে লেখাটা শেষ করছি না।

তাই–তুলতুলির মনের দ্বিধা ভাঙাতে ডাক দিলাম,
আঞ্চলিক   ভাষায়  বললাম,,,,,,,,,,,

তুলতুল (দেহ ছাই ভাত অইছেনি) দেখত ভাত হয়েছে কি না?
উত্তরে সে বলল (অ অইছে) হে হয়েছে।
আমি আবার বললাম,,,,,,,,,,
(তে আইয়উ আব্বুর অঙে ভাত হাইলাউ) তাহলে এস আব্বুর সাথে খাবে।
সে বলল (না আমি অহনে হাইতাম না) না,আমি এখন খাব না।

তুলতুলিকে বললাম–
এই যে তুমি বললে (অহনে হাইতায় না)তোমার এই আঞ্চলিক ভাষা টা একদিন হারিয়ে যাবে,
তখন—-পরবর্তী প্রজন্মান্তরের কাছে হাস্যকর হতে পারে, হতে পারে কিংবদন্তী, অথবা হতে পারে
রুপান্তর অন্য কোন ভাষার সংমিশ্রণে, চলিত, কথ্য, স্বাদু অথবা সংস্কৃত ভাষার প্রভাবও থাকতে পারে।
মনের ভাব প্রকাশ ঠিকই থাকবে,
শুধু পরিবর্তন হবে ভাষার মাধুর্য্যতা।

 

Comments

comments