মাদারীপুরের মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে

0

নিত্যানন্দ হালদার, মাদারীপুর প্রতিনিধি ঃ

এলুমিনিয়াম, প্লাস্টিক, মেলামাইন, সিলভার ও স্টিলের তৈরি অত্যাধুনিক সামগ্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হাজার বছরের পুরনো মৃৎশিল্প প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দুঃপ্রাপ্যতা, পুঁজির অভাব ও দারিদ্র্যের কারণে মাদারীপুরের মৃৎ শিল্পীরা তাদের পেশা ছেড়ে দিতে বাধা হচ্ছেন।যারা এখনও পেশা ধরে রেখেছেন তাদের অনেকেই শিক্ষা, চিকিৎসাসহ আধুনিক জীবনযাত্রার সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

হাজার বছরের লোক ঐতিহ্যের পরিচয় বহনকারী একদল সহজ-সরল মেহনতি মানুষ তাদের হাতের স্পর্শে পলিমাটিকে নানা ঢঙে,নানা আকৃতিতে ও নানা বর্ণে সাজিয়ে তোলেন বর্ণাঢ্য সাজে।কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই কুমারপাড়ার সাধারণ মানুষগুলো তাদের শিল্পী মনের সবটুকু দরদ উজাড় করে দিয়ে মাটিকে শিল্পে পরিণত করেন। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষে মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্ত প্রায়। কুমার সম্পপ্রদায়ের মমতা মেশানো মাটির তৈরি হাঁড়ি, কলস, পাতিল, থালা-বাসন, ঝাঁঝর, মালসা, সানকি, ঘটি, বাটি, চারি, ছাঁকনি, ব্যাংক, কল্কি, প্রদীপ, ফুলের টপ, পুতুল, ছাইদানি, হুঁক্কা দেব-দেবীর মূর্তি, ঢাকনা, পিঠার ছাঁচ, গুড়ের জালা, চাঙ্গারি ছিল এদেশের প্রতিটি মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী।এ মৃৎশিল্পকে অবলম্বন করে মাদারীপুরের শত শত কুমার পরিবারের সদস্যরা খেয়ে-পরে ভালই ছিল।এখানকার কুমার পল্লী বা পাল পাড়ার প্রতিটি বাড়ি ছিল একেকটি শিল্প পরিবার।

সেই কুমার পল্লীতে আজ আর কর্মচাঞ্চল্য নেই। সেখানে বাসা বেঁধেছে দারিদ্র্য, হতাশা, অনাহার, আর বেকারত্ব। আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে এদেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের সাধারণ মানুষও প্লাস্টিক, চিনামাটি,এলুমিনিয়াম, স্টেনলেস স্টিল ও ম্যালামাইন সামগ্রীর প্রতি ঝুকে পড়েছে। এগুলোর স্থায়িত্ব বেশি এবং দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় তারা দূরে ঠেলে দিয়েছে মৃৎশিল্প সামগ্রীকে। এতে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এবং বেকার হয়ে পড়েছে হাজার হাজার কুমার সম্প্রদায়।

মাদারীপুর জেলার চারটি উপজেলায় ৫০/৬০ বছর আগে প্রায় ১০ হাজার কুমার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদের মাটির তৈরি সামগ্রী নৌপথে বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হতো জেলার কুলপদ্বী, মহিষেরচর, রাস্তি, চরমুগরিয়া, মস্তফাপুর, মিঠাপুর, ঘটমাঝি, পেয়ারপুর, রাজৈর, গোয়ালবাথান, খালিয়া, নাগরদি, কবিরাজপুর, শ্রীকৃষ্ণদি, ছিলারচর, দত্তপাড়া,শিবচর, পাচ্চর,নলগোড়া,চরভদ্রাসন,টরকি, কালকিনি, পালপাড়া, ডাসার, টেকেরহাটসহ বিভিন্ন স্থানের কুমারদের কর্মচাঞ্চল্যে এলাকা মুখরিত ছিল। এসব কুমারপাড়া থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় নৌকায় করে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হতো মাটির তৈরি সামগ্রী।এমনকি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মাথায় করে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে তা বিক্রি করতেন। নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় এখন আর নৌপথে মাটির তৈরি সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয় না।

রাজৈর উপজেলার বদরপাশা ইউনিয়নের গোপালগঞ্জ গ্রামের শচীন পাল (৬০) জনান, নদীনালা না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে।তিনি বলেন, উচ্চমূল্যে মাটি ক্রয় ও কাঠ,নাড়া,পাট খড়ি কিনে মাটির তৈরি উপকরণ নির্মাণে খরচ বেশি পড়ে।এখন পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।ছেলে মেয়েরা এখন আর এ কাজে আসতে চায় না। তাই ভাবছি এ পেশা ছেড়ে দিতে।কিন্তু আদি পেশা ছাড়তে কষ্ট হচ্ছে।

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের পাল পাড়ার প্রবীন মৃৎশিল্পী জিতেন পাল(৬৫) বলেন, ৫০ বছর ধরে মাটির তৈরি এসব জিনিস তৈরি করছি।বৈশাখ এলে আমাদের কাজের চাপ বেড়ে যায়।এছাড়া বছরের আর বাকি দিনগুলো আমাদের অনেক কষ্টে পার করতে হয়।তাই অনেকে এই পেশা এখন ছেড়ে দিয়েছে।পাল পাড়ায় প্রায় ৩৫টি পরিবার বসবাস করেন। তাদের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।এর মধ্যে মাত্র ১৫টি ঘরে ঐতিহ্যকে আকরে ধরে আছেন এখনো।

মাদারীপুর সদর উপজেলার বাহাদুর ইউনিয়নের মিঠাপুর গ্রামের পরেশ পাল(৬০)পাল জানান,ছোটবেলা থেকে এ কাজ করে আসছি।মানুষ এখন আর মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসন তেমনি কিনছে না।আগে শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাড়ি থেকে মাটির তৈরি জিনিস কিনে নিয়ে যেত। বর্তমানে তাও আসেনা। এখন নিজেদেরই গ্রামে যেতে হচ্ছে। তাও চাহিদা কম। এ পেশায় টিকে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

একই এলাকার গীতা রানী পাল বলেন,বৈশাখী মেলা উপলক্ষে আমরা খেলনার পাশাপাশি ফুলের টব,সোনালি রঙের পাতিল, ঢোল, মগ, জগ, লবণ বাটি, বদনা ইত্যাদি তৈরি করছি। কারণ এগুলোর চাহিদা বৈশাখে আছে। এছাড়া এই কাজে আমার স্বামীকে নানা ভাবে সাহায্য করি।অন্যান্য সময়ে এ শিল্পের কদর তেমন একটা নেই।

একই এলাকার গকুল পাল(৫০) বলেন,আমাদের অনেক ইচ্ছা আমাদের ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা করাবো কিন্তু টাকার অভাবে তাও করাতে পারি না।সারা বছরই অভাবে সংসার চালাতে হয়।
কালকিনি উপজেলার থানার মোড় এলাকার পালপাড়া গ্রামের মৃৎশিল্পী সুমন পাল বলেন,প্রতিবারের মতো এবারও বৈশাখী মেলার জন্য হরিণ,গরু,ঘোড়া, হাতি, খরগোশ, উটপাখি, হাঁস, বক, টিয়া, গন্ডারসহ নানা ধরনের প্রাণীর আকৃতি তৈরি কওে থাকি।বৈশাখী মেলা শেষ হওয়ার পর আর আমাদের মৃৎ শিল্পের তেমন চাহিদা থাকেনা। তাই এ পেশায় টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ছে।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, জেলায় পাল সম্প্রদায়ের বেশ কিছু পরিবার মাটির সামগ্রী তৈরি করেন। যা আমাদের সংস্কৃতি ঐতিহ্যের প্রকাশ। বর্তমানে প্ল¬াস্টিকের জিনিস মাকের্টে থাকায় মাটির সামগ্রীর কদর কমে এসেছে।মাটির হাড়ি পাতিলের চাহিদা কমে যাওয়ায় ও মাটি ক্রয় করতে হয়, এজন্য তারা আর্থিক সমস্যায় আছে।এই শিল্পকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত বলে মনে করি।তাছাড়া পয়েলা বৈশাখে মাটির থালায় খাবার খাওয়া,আমাদের একটি ঐতিহ্য,এজন্য মাটির জিনিসপত্রের কদর বেড়ে যায়, তবে বছরের অন্য সময় তাদের ব্যবসা মন্দা দেখা যায়। বছরের অন্য সময় তাদের জিনিসপত্র বিক্রি করতে পারলে আমার মনে হয় এই শিল্প টিকিয়ে রাখা যায় এবং আমরা তাদের অসহায় পরিবারদের পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

বিসিকের পরিসংখ্যানমতে,বর্তমানে জেলায় মাত্র ২৪৮টি কুমার পরিবার রয়েছে, যারা দিন দিন অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছে।ঋণদান কর্মসূচির আওতায় পুঁজি দিয়ে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো সমিতি গঠনের মাধ্যমে ঋণ দিয়ে এদের বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

Comments

comments