রহস্যের বাকিটুকু|| সাহিত্য সম্ভার

0

গল্পঃ “রহস্যের বাকিটুকু”
গল্পলেখকঃ তানিয়া আক্তার



 

হারিয়ানা আদর্শ বিদ্যালয়ে শিহ্মক পদে যোগদানের পর শংকর আজ প্রথম ক্লাস নিতে এসেছে। সে বেশ কিছুদিন হল শহর থেকে পড়াশোনা করে গ্রামে এসে থাকছে। তার জন্ম হবার সাথে সাথেই তার বাবা শহরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। গ্রামের কোন স্মৃতিই তার নেই। সে তার গ্রামের জন্য কিছু করতে চায়। দীর্ঘদিন শহরে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারনে গ্রামের সাথে তার যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে, কিন্তুু পড়াশোনা শেষে সে আর দেরী করল না, নাড়ির টানে ফিরে এল গ্রামে।

হারিয়ানা আদর্শ বিদ্যালয়ে যোগদানের পূর্বে অনেকেই যোগদান করার জন্য তাকে নিষেধ করেছিল। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস এ এলাকা জুড়ে রহস্যময় কিছু একটা রয়েছে।
শংকরের আগেও আরও অনেকজন এ বিদ্যালয়ের মাষ্টার হিসেবে যোগদান করেছিল। তাদের ভিতর দুজন মারা গিয়েছে, একজন পাগল হয়ে গিয়ে এখন সারা গ্রাম ঘুড়ে ঘুড়ে আবোল-তাবোল বলে বেড়ায়, আর যারা বেঁচে গিয়েছে তাদের অনেকেই এই অঞ্চল ছেড়ে শহরে চলে গিয়েছে। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস ভূত-প্রেতই এসবের মূলে রয়েছে।

বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ঢুকতেই শংকরের সাথে বিদ্যালয়ের প্রধান শিহ্মক উদয়চরন মূখার্জীর দেখা ।

কি হে শংকর বাবাজী..
প্রনাম স্যার..
আমি তো ভাবলুম তুমি বুঝি আসবেই না।
না স্যার, যোগদান করেছি তো আসার জন্যই।
চল তোমায় সব বুঝিয়ে দেই।
চলুন।
উদয়চরন মূখার্জী সব বুঝিয়ে দিয়ে ভাষ্কর কে ডাকল, শংকরকে ক্লাস রুম দেখিয়ে দেবার জন্য।

আসুন দাদাবাবু, আমার সাথে।
যেতে যেতে শংকর বলল-কাকু তোমাদের এই স্কুল টা অনেক পুরাতন মনে হয়। দেয়াল হ্ময়ে হ্ময়ে যাচ্ছে, কেমন জীর্ণ অবস্থা!!
লাভ কি বাবু ঠিক করিয়ে? ছাত্র-ছাত্রী কম। তাছাড়া কেউ এইখানে এসে পড়াতেও চায় না। আসলেও দু দিন পড়েই চলে যায়।
কেন?
ওই তো বাবু ওইটা আপনার ক্লাসরুম।
ওহ..
ভাষ্কর চলে যাবার সময় কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে গেল, দাদাবাবু আপনিও দেখবেন বেশীদিন থাকতে পারবেন নে। বলেই ভাষ্কর চলে গেল।

উদয়চরন মূখার্জীর সাথে দেখা করতে পুলিশ এসেছে। তারা তার কহ্মে কথা বলছে অমল ঘোষের মৃত্যর ব্যাপারে। অমল ঘোষ এই স্কুলের শংকরের পূর্বে মাষ্টার হিসেবে ছিলেন। তাই পুলিশ তার মৃত্যুর ব্যাপারে জিঙেস করতে এসেছে।
উদয়চরন বাবু আপনার কি মনে হয় না, অমল ঘোষের মৃত্যুটা বড়ই রহস্যজনক ভাবে হয়েছে!! শরীরে কোন আঘাত ছিল না, কিন্তুু মৃত্যুর সময় তার মুখ ভয়ে ভয়ানক রকম বিকৃত হয়ে গিয়েছিল! আপনার কি মনে হয় তার কোন শত্রু ছিল?
সে আমি জানি নে মশায়, বড় ভাল আদমী ছিল। একদিন স্কুলে এসে সে অদ্ভুদ ধরনের কথা বলছিল। বলছিল আজই সব কিছুর সমাধান সে করবে, তার জন্য সে স্কুল ঘরে রাতটি কাটাতে চায়। আমি মশায় তাকে স্কুলঘরে থাকার অনুমতি টুকু দিয়ে দিলুম। কিন্তুু পরদিন তাকে পাশের শিবনাথ জমিদার মহলের বাগান বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। এখন কিভাবে মরল? কে মারল? কিছুই জানি নে মশায়। আমি সামান্য এই স্কুলের হেডমাষ্টার। শিবনাথ জমিদারের উত্তরাধিকারীরা শহর থেকে কিছু খরচাপাতি পাঠায়, এই দিয়ে এই স্কুল চলে।
হুম। আচ্ছা আজ আমরা উঠছি। প্রয়োজন হলে আবার আসব।
সে অবশ্যই আসবেন মশায়, তবে চা-নাস্তা কিছু দিতে বলি?
জ্বী না, অন্য একদিন।

ক্লাস শেষ করে শংকর উদয়চরন বাবুর রুমের দিকে আসতেই দেখল, তার রুম থেকে পুলিশ- কনস্টেবল বের হয়ে যাচ্ছে।

উদয়চরন মুখার্জীর রুমে ঢুকে শংকর জিঙেস করল-
স্যার এখানে পুলিশ কি কারনে?
আরে বাবাজী বলো না, অমল বাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে এই পুছতাছ করতে এল।
স্যার আপনার কি মনে হয়, উনি কিভাবে মারা গিয়েছেন?
জানি নে, জানি নে। বলার সময় উদয়চরন একটু কেঁপে কেঁপে উঠল।

উদয়চরনের রুম থেকে বের হবার সময় ভাষ্করের সাথে তার দেখা হল। সে ভাষ্কর কে জিঙেস করল, আচ্ছা ভাষ্করকাকু, তুমি তখন বলছিলে আমিও বেশীদিন এখানে থাকতে পারব না। কেন বলছিলে ওমন?
জানি নে দাদাবাবু। কেউ তো এখানে এসে টিকতে পারে না, তাই বলেছিলুম। অনেকেই নাকি আশেপাশে অনেক কিছু দেখে।
তুমি নিজে কখনো কিছু দেখেছ?
না দাদাবাবু! এত বছর এই স্কুলের প্রধান পিয়ন হিসেবে আছি, এখন বৃদ্ধ হবার যোগাড়। কখনোই কিছু দেখতে পাই নি। আর এখন তো চোঁখে তেমন ভাল দেখতেই পাই নে।

দুপুরবেলা শংকর স্কুল থেকে বের হয়ে গেল। সে আশে পাশেই ঘুড়তে লাগল। অনেকদিন পর সে গ্রামে এসেছে। তার বেশ ভালোই লাগছে। সে মনে মনে ভাবতে লাগল হারিয়ানা স্কুলের উন্নয়নের ব্যাপারে সে খরচ করবে। ঘরে ঘরে গিয়ে সে অনেক ছাত্র-ছাত্রী জোগাড় করবে, তাদের অভিভাবকদের বুঝাবে পড়াশোনা কত গুরুত্বপূর্ন।
ভাবতে- ভাবতেই হঠাৎ কোন বালিকার সুরেলা খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ তার কানে বেঁজে উঠল।
এই ভর দুপুরে কে এমন হাঁসছে!! কার হাসি এমন সুনশান নিরবতাকে ভেদ করে তানপুরার মত তার কানে বেঁজে উঠছে!!
সে একটু বাঁক নিতেই বুঝতে পারল, হাসির শব্দ স্কুলঘরের কিছু দূরে শিবনাথ জমিদার মহলের বাগানবাড়ি থেকে আসছে। সে এগিয়ে গেল। বাহির থেকে সে কোন মেয়ের কথা শুনতে পাচ্ছে। মেয়েটি বলছে, লহ্মা কেন দুষ্টুমি করছিস?? লহ্মা ছাড় বলছি, সুড়সুড়ি লাগছে তো। শব্দ করিস নে, বাপু জানতে পারলে সেই মার পড়বে, বলেই মেয়েটি আবারও খিলখিলিয়ে হাসি শুরু করল। সে হাঁসি যেন আকাশ পাতাল ভেদ করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এই জমিদার বাড়িতে শংকর শুনেছে অনেক কাল ধরে কেউ থাকে না। বাড়িটি শূণ্য পড়ে রয়েছে। শংকরের বুঝতে দেরী হল না, বাগানবাড়িতে কোন গ্রাম্য মেয়ে কোন বখাটে ছেলের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। তার মানে এদের মতন মানুষ গুলোই হচ্ছে সাধারন গ্রামের সহজ মানুষগুলোকে ভয় দেখানোর কারন। সে কি করবে বুঝতে পারছে না। গ্রামের মানুষগুলোকে ডেকে এনে দেখিয়ে দেবে এদের কীর্তি!! নাকি সে নিজে আগে কথা বলবে!! হ্যা সে নিজেই আগে কথা বলবে, ভেবেই সে বাগানবাড়ির পেছনের দিকে ভাঙ্গা পাঁচিল টপকে সে ভেতরে ঢুকে গেল। ঢুকে একটু হাটতেই যা দেখল সে দেখে অবাক হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল।

সে দেখল তের-চৌদ্দ বছরের এক মায়াবী চেহারার শাড়ি পড়া সুশ্রী বালিকা সাথে এক কুকুর নিয়ে গাছ থেকে পাঁকা কুল পেড়ে পেড়ে তার শাঁড়ির আঁচলে ভরছে। তার দু-পায়ের নূপুর তার হাটার তালে তালে বাঁজছে। কুকুরটি বারবার তার পায়ের কাছে গিয়ে নাক ঘসছে। আর মেয়েটা চেঁচিয়ে বলছে, লহ্মা সর বলছি, সব কুল পড়ে গেল বলে। বলেই মেয়েটি আকাশ-পাতাল কাপিয়ে হাসছে।

তার মানে শংকর এতহ্মন যা ভাবছিল তা কিছুই না। আর লহ্মা হচ্ছে মেয়েটির কুকুরের নাম। কিন্তুু এই মেয়েটি এখানে একা একা এল কী করে? জমিদার বাড়ির কেউ কি শহর থেকে এল নাকি!! মেয়েটি কে দেখে যদিও শহরের মনে হচ্ছে না। সে ভাবল মেয়েটাকে ডেকেই জিঙেস করা যাক মেয়েটি কে!! যখনই ডাকতে যাবে, তখনই মেয়েটি তার চোখাচোখি হল। তাকে দেখতে পেয়েই এতহ্মন হাঁসতে থাকা মেয়েটি ভয়ে কুকড়ে মুকড়ে গেল। ভয়ে তার কাজল দেয়া দুটি চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে এক-পা দু-পা পিছিয়ে গিয়েই, লহ্মা ভাগ বলেই অন্দরমহলের দিকে দৌড় দিল। দৌড় দেবার সময় তার হাতের রেশমী চুড়িগুলো রিনিঝিনি শব্দে বাঁজতে লাগল। আর তার আঁচল থেকে সব কুল মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।

শংকর কিছুই বুঝল না, তাকে দেখে এত ভয় পাওয়ার কি আছে!! শংকর মেয়েটিকে বারবার ডেকেও ফেরাতে পারল না।

বাড়ি ফিরে শংকর প্রদীপ জ্বালালো। রাতের খাবার শেষ করে প্রদীপের আলোয় সে একটা বই নিয়ে বসল। কিন্তুু বই- এ কিছুতেই সে মন দিতে পারল না। বারবার নূপুর পড়া দু- পায়ের গুঞ্জন আর হাত ভর্তি চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ তার কানে বাঁজতে লাগল।
এসবের মধ্য দিয়ে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়ল, ঘুমের ভিতর সে অদ্ভুদ স্বপ্ন দেখল, যে ভরদুপুরে মায়াবী চেহারার মেয়েটি আর সে মিলে পুকুর-ঘাটে স্মান করছে, মেয়েটি পুকুরের পানি ছিটিয়ে তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে আর খিলখিল করে হাঁসছে। আর শংকর মুগ্ধ হয়ে সে হাঁসি দেখছে।

ভোরের দিকে শংকরের ঘুম ভেঙ্গে গেল, এত কম বয়সী একটা মেয়ের সাথে এরকম একটা অদ্ভুদ স্বপ্ন দেখার জন্য সে একটু লজ্জ্বিত-ই বোধ করল।
সে নাস্তা করে নিয়ে স্কুলে যাবার জন্য তৈরী হয়ে নিল। পথে যেতে যেতে সে ভাবল, মেয়েটির ব্যাপারে খোঁজ নিতে হবে। ভাষ্করকাকুর তো অনেক বয়স। তাকে জিঙেস করলে নিশ্চই কিছু বলতে পারবে যেহেতু সে এত বছর ধরে এখানে আছে। স্কুলে গিয়ে ক্লাস শেষ করে সে ভাষ্কর কে তার রুমে ডেকে পাঠাল। দশ-বারো বছরের এক বাচ্চা এসে বলল, তিনি আজ আসেন নাই।
ওহ…
সাব.. চা দিমু?
না। তোর নাম কী?
দেবু।
দেবু.. ভাষ্করকাকু আসলে অবশ্যই বলবি যাতে আমার সাথে দেখা করে।
তিনি তো আইজ আর আসবে না। কয়দিনের জন্য ছুটিতে গেছে।
আচ্ছা ঠিকাছে। তুই যা।

শংকর ভাবল, এখন সে কিভাবে মেয়েটির খোঁজ নিবে! উদয়চরন বাবু কে কি জিঙেস করবে!!.? সে ও তো অনেককাল যাবৎ এখানে আছেন।
না থাক!! হঠাৎ কোন মেয়ের খোঁজ নেওয়াকে উদয়চরন বাবু অন্য অর্থ করে বসতে পারেন। সে সিদ্ধান্ত নিল, আজ সে আবার সেখানে যাবে, যদি মেয়েটি আজও আসে, গিয়ে সরাসরি মেয়েটিকেই তার পরিচয় জিঙেস করবে।

সে আবারো সকাল ১১ ঘটিকায় পাঁচিল টপকে বাগানবাড়িতে প্রবেশ করল।
কিন্তুু গিয়ে মেয়েটিকে আর দেখতে পেল না। সে অনেকহ্মন অপেহ্মা করল। মেয়েটি বা তার কুকুর লহ্মার কোনই সাড়াশব্দ পেল না। সে অনেকহ্মন অপেহ্মা করে যখন ফিরে আসবে, তখন দেখতে পেল গতকালের মেয়েটার আঁচল থেকে পড়ে যাওয়া পাঁকা কুল গুলো ফেটে মাটিতে বিছিয়ে রয়েছে। শংকর কিছুটা অনুতপ্ত বোধ করল। তার জন্য মেয়েটির সব কুল পড়ে গিয়েছিল। অনুতপ্ততার জন্যই হবে হয়তো শংকর নতুন করে গাছ থেকে পড়া কুল গুলো কুড়িয়ে একটা বড় পাতায় মুড়িয়ে রেখে চলে এল।

রাতে বাড়ি ফিরে শংকরের কেমন যেন ছটফট লাগছে। কেন মেয়েটি এল না!! মেয়েটি কি সেদিন তাকে দেখে খুব ভয় পেয়েছিল?? সে কি ভয় পাবার মত এমন কিছু করেছিল!? সাত- পাঁচ ভাবতে ভাবতে শংকর ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে উঠে সে স্কুলে গেল, সে কিছুতেই তেমন মনোযোগ বসাতে পারল না। সে সর্বহ্মন মেয়েটিকে নিয়েই ভাবল। সে আজ যাবে কিনা? মেয়েটি আজও যদি না আসে! হঠাৎ তার মনে হল, তার সে স্বপ্নের কথা, স্বপ্ন টিতে সে দেখেছিল সে ভরদুপুরে মেয়েটির সাথে স্মান করছিল। যেদিন সে মেয়েটিকে প্রথম দেখেছিল, সেদিনও ভরদুপুর ছিল। তার মানে মেয়েটি ভরদুপুরেই আসে!! কারন মেয়েটি বলছিল, বাপু জানলে মার পড়বে, তার মানে হচ্ছে এই দুপুর টাইমে কেউ থাকে না, সবাই হয়তো যার যার মত বিশ্রাম নেয়, তখন-ই হয়তো মেয়েটি চুপিচুপি বাগানবাড়ির কুল গাছটার নিচে গিয়ে কুল কুড়ায়। ভাবতে ভাবতেই শংকরের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। সে ঠিক করল আজ ভর দুপুরেই সে বাগানবাড়িতে যাবে। ঠিক তখনই দেবু এল।
কিরে দেবু কিছু বলবি?
স্যারে ডাকে।
আচ্ছা তুই যা। আমি আসছি।

স্যার আসব?
হ্যা শংকর বাবাজী.. এসো এসো। বসো।
ধন্যবাদ স্যার।
তো বাবা স্কুল কেমন লাগছে?
জ্বী স্যার ভালো। তবে আমার মনে হয় স্কুল উন্নয়নের ব্যাপারে আমাদের কিছু পদহ্মেপ নেওয়া উচিত।
তা উচিত তবে কে করবে এসব? আমিও এমন ভেবেছিলুম, কিন্তুু আর হয়ে উঠল কোথায়?
আমাদের আরও ছাত্র-ছাত্রী আর শিহ্মক বাড়াতে হবে।
কিন্তুু…….
কিন্তুু না স্যার। আপনি বললে আমি এসব নিয়ে আগাতে পারি। তবে আজ আমার উঠতে হবে স্যার। প্রনাম।
আচ্ছা। সাবধানে যাও। বাড়ি চলে যেও। ভরদুপুরে এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করো না যেন।

শংকর বাগানবাড়ির পেছন দিকের দেয়ালে এসে দাড়াল। শব্দ শুনে বুঝল মেয়েটি আজ এসেছে। শংকর ভাঙ্গা পাঁচিল গলে ভেতরে ঢুকে গেল। আবারও সেই নূপুরের ঝংকার চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ তাকে মোহিত করে তুলল। আর সেই ভুবন ভুলানো হাসির শব্দ তাকে একেবারেই দিশেহারা করে তুলল।

কিন্তুু শংকর চিন্তা করেছে, আজ সে মেয়েটির সামনে যাবে না। তাকে দেখলে আবারও যদি মেয়েটি দৌড়ে পালিয়ে যায়!!! তাই সে একটি বড় পাকুর গাছের আড়ালে গিয়েও দাড়ালো। দেখতে পেল মেয়েটি আজও তার কুকুর লহ্মাকে নিয়ে কুল কুড়াতে ব্যস্ত। লহ্মা সর বলছি, কুলগুলি মাড়িয়ে নষ্ট করবি না বলে দিলুম। বলেই হাসি। কুকুরটি ও মনে হয়, তার ভাষাতে ঘেউঘেউ করে তার হাসির জানান দিল। হঠাৎ শুকনো পাতা শংকরের পায়ের নিচে পড়ে নিরবতা কে ভেঙ্গে খানখান করে দিল। মেয়েটি সাথে সাথেই ভয় পাওয়া হরিনীর মত এদিক-সেদিক নজর ঘুড়িয়ে আনল। তখনই শংকর পাকুর গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে মেয়েটির সামনে এল। সে ভেবেছিল, মেয়েটা আজও বুঝি ভয় পেয়ে দৌড় দিয়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তুু আজ মেয়েটি পালিয়ে গেল না। বরং উৎসুক্য দৃষ্টিতে তাকে দেখতে লাগল। তারপর মেয়েটি মুখ ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে টেনে টেনে ছোট কিশোরীদের মত বলল-

ওহ তুমি!! তাহলে তুমি-ই গতকাল আমার জন্য কুল কুড়িয়ে রেখে গিয়েছিলু?
শংকর অবাক হল, মেয়েটির মুখে এখন এতটুকু ভয় নেই। উল্টো চঞ্চলতা তার পুরো শরীরে খেলা করছে।
শংকর বলল, হ্যা আমিই রেখে গিয়েছিলাম, সেদিন আমার জন্য তোমার সব কুল পড়ে গিয়েছিল যে!!
আমি হারিয়ানা স্কুলের……. শংকর কথা শেষ করতে পারল না…. মেয়েটি বলে উঠল জানি গো জানি.. তুমি আমাদের স্কুলের মাষ্টারবাবু।
তুমি কি করে জানলে?
ওমা!! বলে কী!! আমি জানব না….!! মাষ্টারবাবু হারিয়ানা আমাদেরই স্কুল যে…

তোমাদের স্কুল মানে? কিন্তুু তুমি কে?
মেয়েটি তার মাথা দুলিয়ে দু-বেণী পিছনে দিয়ে ছোট বাচ্চাদের মত মুখ বাকিয়ে বলল- বারে!! আমি হচ্ছি ঝুমড়ি। জমিদারের মেয়ে গো।
আর এই আমার লহ্মা। লহ্মাকে পরিচয় করিয়ে দিতেই লহ্মা ঘেউঘেউ করে তার অস্তিত্বের জানান দিল।
লহ্মা ক্রমাগত ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে।
ঝুমড়ি বলছে, চুপ কর বলছি এবার মার খাবি লহ্মা। তারপরও লহ্মা ঘেউঘেউ করেই যাচ্ছে। এবার ঝুমড়ি তাকে কুল গাছের পাশে একটা খুটির সাথে বেঁধে দিল। কিন্তুু লহ্মা ঘেউঘেউ করেই চলছে। শংকর কিছুই বুঝল না, কোন জমিদারের মেয়ে সে। সে যতটুকু শুনেছে জমিদার বাড়ি এখন শূণ্য পড়ে আছে। তবে শহর থেকে জমিদার বাড়ির লোকজন মাঝে মাঝে আসে। হয়তো তাদের কারোরই মেয়ে ঝুমড়ি।

ঝুমড়ি এসে বলল- হ্যা গো বাবু তুমি কিছু মনে করো না যেন। লহ্মা আমায় ভীষন ভালবাসে, তাই অন্য কাউকে সে মেনে নিতে পারে না।
হুম ঝুমড়ি বুঝেছি। কিন্তুু তুমি প্রতিদিন ভরদুপুরে এই কুল তলার নিচে কেন আসো? তোমার ভয় করে না?

কথা শুনেই ঝুমড়ি আবারও আকাশ- পাতাল কাপিয়ে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠল।
হাসি থামিয়ে বলল, বারে ভয় করবে কেন? এটাতো আমারই জায়গা। নিজের জায়গায় আসলে কেউ বুঝি ভয় পায়!! বলেই আবারও ঝুমড়ি হাসতে আরম্ভ করল। হঠাৎ সে চমকে উঠল। হাসি থামিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, এই বাপু বুঝি আসল। আমি চললেম। বলেই সে লহ্মার বাঁধন খুলে লহ্মাকে সাথে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল। পেছন ফিরে একবার বলে গেল, মাষ্টার বাবু কাল আবার দেখা হবে, তুমি আজ যাও।

পরদিন সে আবার গেল বাগানবাড়িতে। কিন্তুু ঝুমড়ি এল না। এভাবে পরপর আরও কয়েকটাদিন কেটে গেল, কিন্তুু ঝুমড়ির দেখা নেই। শংকর কোন কিছুতেই মনোযোগ বসাতে পারছিল না। মায়াবী চেহারার কাজল দেওয়া দুটি চোখ বারবার তার হৃদয় টাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলছিল। কি যে অন্তরদহনে সে ভুগছিল তা কেবল ঈশ্বরই জানেন। সে প্রদীপ জ্বালিয়ে টেবিলে বসে একটি কাগজে কি যেন লিখল। লিখে খামে ভরল।

তারপরদিন সে উদয়চরন বাবুর কহ্মে গিয়ে একটি খাম ধরিয়ে দিল। এবং বলল স্যার আমি আর এখানে থাকতে পারছি না। এই আমার ইস্তফা পত্র।
উদয়চরন মূখার্জী অবাক হয়ে বললেন, কেন বাপু?? তোমার আবার কি হল? কয়দিন আগেই যে বললে, স্কুল উন্নয়নের কাজ ধরবে। আরও কত কিছু। হঠাৎ কি হল?
শংকর এবার মুখ তুলে তাকাল- তার চোঁখ মুখ লাল দেখে উদয়চরন বলল, বাবা রাতে কি ঘুম হয় না? নাকি শরীর খারাপ?
শংকর বলল, এমন কিছুই না স্যার। আমি কিছু ব্যাক্তিগত কারনে এখানে থাকতে পারছি না। তবে স্কুল উন্নয়নের যেসব কথা বলেছি, তা আমি করব। আমি শহর থেকে খরচ যা লাগে সব পাঠাবো আপনি সামনে থেকে সব দেখভাল করবেন। উঠি স্যার, প্রনাম। বলেই

শংকর উঠে বের হয়ে গিয়ে দরজার সামনে ভাষ্করকে দেখতে পেল-
ভাষ্কর বলল, দাদাবাবু বলেছিলুম না? বেশী দিন থাকতে পারবেন না!! শংকর স্মিত একটা হাসি দিয়ে চলে গেল।

বাগানবাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় শংকর একবার ভাবল, শেষ একবার কি সে বাগানবাড়িতে ঢুকবে? যদি ভাগ্যবশত শেষ একবার ঝুমড়ির দেখা পায়, যদি সত্যিই তা হয়, ঝুমড়ি কে আচ্ছামত শুনিয়ে দেবে যে ঝুমড়ি কথা দিয়ে কথা রাখে নি, সে আসে নি পরদিন দেখা করতে, তাই শংকর কষ্ট পেয়ে এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। যেখানে মানুষ কথা দিয়ে কথা রাখে না আর কোনদিন সে আসবে না এমন জায়গায় ।
কিন্তুু পরহ্মনেই ভাবল, কেন সে এসব ভাবছে? ঝুমড়ির কি এমন দায় পড়েছে কথা রাখার!! ঝুমড়ি আজও আসবে না। মিথ্যা আশা নিয়ে ভেতরে গিয়ে সে শুধু কষ্টই পাবে।

হঠাৎ সে শুনতে পেল কুকুরের ঘেউ-ঘেউ শব্দ। আরে.. এ তো ঝুমড়ির লহ্মা!! হ্যা… লহ্মাই তো। কিন্তুু ঝুমড়ির তো কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। সে বাগানবাড়িতে ঢুকতে গিয়ে দেখল, বাগানবাড়ির ভাঙ্গা পাঁচিল টুকু আর নেই।
আরে এটাতো কয়দিন আগেই ভাঙ্গা ছিল, কে ঠিক করল?? বাড়িতে জমিদাররা এসে থাকতে শুরু করেছে, তারাই হয়তো ঠিক করেছে।

শংকর উঁচু পাঁচিল টপকে বাগানবাড়িতে ঢুকল। ঢুকে দেখল, সেই খুটির সাথে লহ্মাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। লহ্মার মাথা দিয়ে রক্ত গলগল করে পড়ছে, সে রক্তে বাগান ভেসে যাচ্ছে। কিন্তুু লহ্মা হ্মীপ্র হিংস্রাত্বক ভঙ্গিতে ঘেউঘেউ করে ডেকে যাচ্ছে। শংকর কিছুই ভেবে পেল না, কে এমন নিষ্ঠুর ভাবে লহ্মাকে মারল। ঝুমড়িই বা কোথায়। তার প্রিয় লহ্মার এই অবস্থা দেখে সে কি করে চুপ রয়েছে?? লহ্মার দিকে যেতেই লহ্মা আরও জোরে জোরে গর্জন করছে। সে গর্জন কান ভেদ করে মাথায় গিয়ে লাগছে। এত জোরে শব্দ করছে, অথচ জমিদারবাড়ির কেউই শুনছে না, নাকি তারাই মেরে বেঁধে রেখে লহ্মার কাছ থেকে ঝুমড়িকে নিয়ে গিয়েছে!! শংকর কিছুই বুঝতে পারছে না। লহ্মার কাছে এগিয়ে যেতেই বুঝতে পারল, লহ্মা কুল গাছের দিকে মুখ করে ডাকছে, আর তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে তার রক্তের সাথে মিশে মাটিতে পড়ছে। শংকর এবার কুল গাছের দিকে গেল। যা দেখল তা দেখার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না।

ঝুমড়ি কুল গাছটার সাথে ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলে কাতরাচ্ছে। তার চোখ-মুখ উল্টে যাচ্ছে। সে একটু বাঁচার জন্য কেমন ছটফট করছে!!
দেখে শংকর সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলল, শংকর আর দেরী করল না, সে ছুটে গেল ঝুমড়ি কে বাঁচাবার জন্য। কিন্তুু তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। সে এতটুকু শক্তি পাচ্ছে না ঝুমড়ির কাছে যাবার জন্য। সে ঝুমড়ির কাছে ছুটে যেতেই মাথা ঘুড়ে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। লহ্মার হৃদয় বিদারক চিৎকার আস্তে আস্তে যেন কমে এল। তারপর আর তার কিছুই মনে রইল না।

শংকরের জ্ঞান ফিরল চারদিন পর। জ্ঞান ফেরার পর সে নিজেকে আবিষ্কার করল বড় একটি খাটের শ্বেতশুভ্র একটি বিছানায়। তাকে জ্ঞান ফিরতে দেখে উদয়চরন বাবু বলে উঠল, ঈশ্বরের কৃপা তোমার জ্ঞান ফিরেছে, আমরা যা ভয় পেয়েছিলুম! শংকর বুঝতে পারল এটা উদয়চরনবাবুর বাড়ি। পাশেই ছিল ভাষ্করকাকু। সেও যেন শংকরের জ্ঞান ফিরে আসাতে স্বস্তি ফিরে পেল।

ভাষ্কর বলল, এখন কেমন আছ দাদাবাবু?
আমি ভাল। আপনারা আমার কথা ভাববেন না, কিন্তুু ওকে বাঁচাতে হবে, ও নয়তো মারা যাবে। আপনারা জলদি করুন।
উদয়চরনবাবু অবাক হয়ে বললেন, কি বলছ বাবাজী? কাকে বাঁচাতে হবে?
ঝু..ঝুমড়ি কে….. আমি একটু আগে বাগান বাড়িতে দেখেছি, ওর গলায় ফাঁস লাগানো, ও মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। এখনি না গেলে ওকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।

তুমি কি বলছ, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু আগে কাকে কোথায় দেখতে পেলে বাপু? তোমার জ্ঞান-ই তো ফিরল চারদিন পর। আমরা এ কয়দিন ঈশ্বরের নাম জপেছি, তুলশী গাছে নিয়মিত প্রদীপ জ্বেলে জল দিয়েছি। ঠাকুরের নামে পূজো করে প্রার্থনা করেছি তোমার যাতে জলদি হোঁশ ফিরে।

হ্যা দাদাবাবু। সাব ঠিক বলছেন। চারদিন আগে আপনি স্কুল ছেড়ে চলে যাবার কিছু সময় পর আমি হঠাৎ আপনার চিৎকার শুনে আপনাকে খুজতে আরম্ভ করি, শেষে বাগানবাড়ির ভাঙ্গা পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে আপনাকে দেখে সাব কে খবর দেই, আমরা গিয়ে দেখতে পেলুম আপনি বেহুঁশ হয়ে কুল গাছের তলায় পড়ে রয়েছেন। এরপর সাব আপনাকে বাড়িতে এনে দেখভাল করেছেন। আর এই চারদিন আপনি বেহুঁশ ছিলেন।

শংকর কিছুই মিলাতে পারছে না। সে তো সেদিন ভাঙ্গা পাঁচিল দেখতে পায় নি, তার যতটুকু মনে আছে, সে উঁচু দেয়াল টপকে বাগানবাড়িতে ঢুকেছিল। তাহলে ভাষ্করকাকু কিভাবে……….
এবার শংকর সব খুলে বলল জমিদারের মেয়ে ঝুমড়ির কথা, যে তার সাথে শংকরের কথা হয়েছে।
এ কথা শুনে উদয়চরন এবং ভাষ্কর দুজনই অবাক হয়ে গেল। উদয়চরন বাবু বললেন, ঝুমড়ি কিভাবে আসবে ঝুমড়ি তো মারা গিয়েছে।

শংকর এবার মন খারাপ করে বলল, আমার জন্য মারা গিয়েছে। আমি চারদিন আগে জ্ঞান হারিয়ে না ফেললে ঝুমড়ি কে বাঁচাতে পারতাম।
দাদাবাবু কি বলছেন? ঝুমড়ি বেটী তো বিশ সাল আগেই মারা গিয়েছে।
এবার শংকর অবাক হল মানে?? আমি তো ওকে আমার সামনেই মরতে দেখলাম।
উদয়চনের স্কুলে যেতে হবে, সে ভাষ্কর কে,, শংকরের দেখাশোনা করতে বলে চলে গেল।
ভাষ্কর কাকু আমাকে সব খুলে বলুন।

সে অনেক কথা।
আমি শুনতে চাই।
ভাষ্কর বলা শুরু করল, জমিদার শিবনাথ প্রসাদের ছিল সাত ছেলে। সাত ছেলের মধ্য ছয় ছেলেই পড়াশোনা করতে বিলেত চলে গিয়েছিল। শুধু বড় ছেলে হারিয়ানা প্রসাদ বাবার সাথে থেকে গেল জমিদারী দেখভালের জন্য। শিবনাথ বাবু মারা যাবার সময় তার সকল জমিদারী বড় ছেলের নামে করে যান। অন্যান্য সব ভাইদের ছেলে থাকলেও হারিয়ানা প্রসাদের কোন ছেলে ছিল না, তার শুধু একটি মেয়ে ছিল। তার মৃত্যুর পর এত সম্পদ কি করবে, কে সামলাবে তাই সে গ্রামে বিভিন্ন জায়গায় স্কুল-কলেজ, মন্দির, হাসপাতাল নির্মান করেন। সে চায় তার সম্পত্তির ভাগ যাতে ভাইরা নেয়, তাই সে ভাইদের খবর দিত,এসে জমিদারী বুঝে নেবার জন্য। কিন্তুু ভাইদের আর পড়াশোনা শেষ হয় না। সে তার একমাত্র মেয়েটিকে ভীষন ভালবাসত। আর মেয়েটিও ছিল, ভালবাসার মতনই। গ্রামের মানুষগুলোকে সে ভীষন ভালবাসত। এতটুকুন মেয়ে কিনা খুব অল্প বয়সেই সবার মনে পাকাপোক্ত আসন করে নিয়েছিল। গ্রামের মানুষরা ও ঝুমড়ি বলতে পাগল ছিল। ঝুমড়ি সুযোগ পেলেই এর ওর বাগানে গিয়ে ফল কুড়িয়ে আনত। এইজন্য তার বাবা বেশ রাগ করত। সে তার আদরের মেয়েটিকে একটু সময় একা ছাড়তে চাইত না। কারন তখন গ্রামে ডাকাতের উৎপাত শুরু হল।
সে তার জমিদার মহলের পাশে বিশাল একটি বাগানবাড়ি বানাল, উঁচু পাঁচিলে সে বাগান মুড়ে দিল, বাগানে লাগাল বিভিন্ন রকম গাছ। বৃদ্ধ ভাষ্কর বলতে বলতে একটু হাঁপিয়ে উঠল।

শংকর অধৈর্য হয়ে বলল তারপর…..
তারপর ঝুমড়ির প্রিয় স্থান হলো সে বাগানবাড়ি। বছর কয়েকের মধ্য গাছপালা গুলো বড় হয়ে তার ডালপালা ছড়িয়ে দিল। ঝুমড়ি তার প্রিয় কুকুর লহ্মাকে নিয়ে বেশীরভাগ সময়ই সে বাগানবাড়ি তে কাটাত। তার প্রিয় জায়গাটি ছিল বাগান বাড়ির কুল গাছের তলা। শাড়ির আঁচল ভরে প্রিয় লহ্মাকে নিয়ে সে পাকা পাকা কুল কুড়াতো। তখন গ্রামে এমন ডাকাতের উৎপাত শুরু হল, জমিদার হারিয়ানা ঝুমড়িকে বাগানবাড়িতে যেতেও নিষেধ করে দিল। কিন্তুু তারপরও চঞ্চল ঝুমড়ি সুযোগ পেলেই ভরদুপুরে চুপিচুপি বাগান বাড়িতে চলে যেত।

এমনই এক ভরদুপুরে কিছু ডাকাত জমিদার বাড়ি লুট করার উদ্দেশ্য বাগানবাড়ির উঁচু দেয়াল টপকে বাগানবাড়িতে ঢুকে গেল। ঢুকেই তারা ঝুমড়ি কে দেখতে পেল। ছোট ঝুমড়ি ডাকাতদের কাম লালসার স্বীকার হল, তারা লহ্মার মাথায় তাদের অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে একটি খুটির সাথে বেঁধে রাখে। বেজবান লহ্মা, তারই সামনে তার বন্ধুর এ অবস্থা দেখে গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। ঝুমড়ি তাদের হাত-পা ধরে বলেছে কাকু আমায় তোমরা ছেড়ে দাও। কিন্তুু ডাকাতরা তাদের কাম লালসা মিটিয়ে তারপরই হ্মান্ত হল। এরপর তারা সবাইকে রুমে জিম্মি করে জমিদারী সম্পদ লুট করে চলে গেল।

ছোট ঝুমড়ি কি বুঝত জানি না। তবে এতটুকু বুঝে গিয়েছিলু সে, সমাজ তাকে আর মেনে নেবে না। সে তার মুখ তার প্রিয় বাবা কে আর দেখাতে পারবে না। সে তার শাড়ি খুলে তার প্রিয় কুল গাছটার সাথে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করল।

গ্রামের মানুষরা কোদাল-শাবল এনে পাঁচিল ভাঙ্গল ঝুমড়িকে বাঁচাবার জন্য।
বাবা হারিয়ানা ছাড়া পেয়ে মা আমার মা আমার করে ছুটে এল। কিন্তুু ততহ্মনে সব শেষ।
হারিয়ানা মেয়ে শোকে পাগল হয়ে যান,তাকে তার ভাইরা চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে গেলেন। তিনি সেখানেই মারা যান। আর লহ্মা মাথায় আঘাত আর ঝুমড়ির শোকে পাগল হয়ে তিন-চারদিনের মাথায় গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে মারা যায়। লহ্মার এত কষ্টের মরন দেখে গ্রামের সব মানুষ কেঁদেছিলু।
বলতে বলতেই ভাষ্করের চোখে পানি চলে এল।
কিন্তুু তারপর থেকেই ঝুমড়ি মানুষ মেরে তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিচ্ছে।
শংকর বলল, এটা ঝুমড়ি করতে পারে না।
কিন্তুু গ্রামের মানুষ তো তাই বলে, দুটো মানুষ যে এর আগে মরেছিল তাদের লাশ ও ওই বাগানবাড়িতে পাওয়া গিয়েছিলু।

শংকর সব শুনে পাথর হয়ে গেল। নিজের বাড়িতে ফিরে এল। সে কিছুতেই ঝুমড়িকে ভুলতে পারছে না, বারবার ঝুমড়ির নূপুর আর চুড়ির শব্দ তার কানে বেজে বেজে উঠছে। তার সে ভুবন ভুলানো হাসি সে যেন চোখ বন্ধ করে দেখতে পাচ্ছে। নিজেকে তার অনেক অপরাধী মনে হচ্ছে, যে ঝুমড়ির ওপর এত অত্যাচার হয়েছে, সে ঝুমড়িকে ভুল বুঝে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী ভেবেই কিনা, সে চলে যেতে চেয়েছিল।
কিন্তুু সাথে তার মন সায় দিচ্ছিল না ওই মায়াবী চেহারার কমবয়সী মেয়েটা কোন মানুষ খুন করতে পারে!! সে কিছুই ভাবতে পারছে না, সে আর থাকতে পারছে না, উঠে ব্যাগ গোছালো। আগামীকাল-ই সে গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে।

সে কখন ঘুমিয়ে পড়ল নিজেই টের পেল না- সে স্বপ্নে দেখল, স্বপ্নে আবার সে পুকুরঘাট টি দেখতে পেল। ঝুমড়ি তাকে পানি ছিটিয়ে দিয়ে খিলখিল করে হাঁসছে। শংকর তাকে মুগ্ধ হয়ে দেখছে, হাসতে হাসতেই ঝুমড়ি হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল। তার ফর্সা গাল দুটো কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতেই সে শংকর কে বলল, মাষ্টার বাবু তুমি বিশ্বাস কর যে আমি কাউকে মারতে পারি? যে দুজন মারা গিয়েছিলু তারা আমাকে গাছের সাথে ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলতে দেখে নিজে নিজেই ভয় পেয়ে মারা গেল। আমি সত্যি বলছি, বাবু তোমার ঝুমড়ি কাউকে খুন করে নি। বলেই ঝুমড়ি আবার কাঁদতে শুরু করল।

হ্যা আমি জানি ঝুমড়ি, তুমি কাউকে খুন করতে পারো না, তুমি কাউকে খুন করতে পারো না, খুন করতে পারো না, খুন করতে…….. ঘুমের ভেতর বলতে বলতেই হঠাৎ শংকর জেগে উঠল। তার সারা শরীর ঘেমে গেল। সে এখন বুঝতে পারছে, ঝুমড়ি তার স্বপ্নে এসেছিল শুধু মাত্র তাকে সত্য জানাতে। ঝুমড়ির কাজ শেষ। সে আর কোনদিনও তার স্বপ্নে আসবে না। পরদিন শংকর শহরে ফিরে গেল।

এর পর ২৫ বছর কেটে গেছে। আগামীকাল শংকরের বড় ছেলের বিয়ে। ছেলেরা বায়না ধরেছিল, তাদের বাবা, তাদের মাকে বিয়ে করার আগে কাউকে ভালবেসেছিল কিনা, অনেক জোড়াজুড়ির পর শংকর তাদের এই কাহিনী বলার পর দুই ছেলেই এখন কাঁদছে। শংকর পড়েছে বিব্রত অবস্থায়।

আরে তোদের নিয়ে তো বড় বিপদে পড়া গেল। কাল একজনের বিয়ে, দামড়া ছেলেরা নাকি কাঁদছে।
আর তোর কি হয়েছে? গাঁধা কোথাকার।
কিন্তুু ছেলেরা কেঁদেই চলছে। দুটোই হয়েছে একদম মায়ের মত ইমোশোনাল। আগামী কাল দেখা যাবে, মেয়ের পরিবর্তে গাঁধা ছেলেটাই কিনা তার মা কে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। যা ঘুমোতে যা। অনেক রাত হয়েছে।
ছেলেরা কাঁদতে কাঁদতেই চলে গেল।

শংকর ধ্যানে পড়ে গেল, ছেলেরা জানতে চেয়েছিল তার বাবার প্রথম ভালবাসার কথা।
হ্যা.. এ কথা বলতে বাঁধা নেই, দু-তিনদিন দেখা সে অন্য জগতের চঞ্চলা মায়াবী কিশোরীই ছিল তার প্রথম ভালবাসা। যার কিনা বাস্তব কোন অস্তিত্বই ছিল না।
ঝুমড়ি আর কোন দিনই তার স্বপ্নে আসে নি, কিন্তুু শংকর তাকে কখনোই এক মূহুর্তের জন্য ভুলতে পারে নি। শংকর এখনও ভুলতে পারে না সে শেষ স্বপ্নের কথা, তোমার ঝুমড়ি কাউকে খুন করে নি। যখনই ঝুমড়ির কথা তার মনে পড়ে তখনই সে চোখ বন্ধ না করেও দেখতে পায়,

কিন্তুু তুমি কে??
ঝুমড়ির সেই মাথা দুলিয়ে বেণী পেছনে দিয়ে ছোটদের মতন মুখ বাঁকিয়ে বলা, বারে….. আমি ঝুমড়ি।

Comments

comments