রিভলভার || ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

0

[পর্ব-১]

রোজকার মতো আজও সে পেছন মোড়া করে আমার হাত দুটো বেঁধে রেখেছে।নিজের বা হাতের পাতায় থালাটা রেখে কেমন চটকে চটকে ভাত মাখছে আর ফাঁকে ফাঁকে কটমট করে আমার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে।আমি তাকিয়ে আছি ভাতের দিকে।ভীষন ক্ষুধা পেয়েছে আমার। দস্যি ছেলে একটা, অযথাই আমায় আঁটকে রেখেছে।সারাটা দিন এই ঘরের চার দেয়ালে বুঝি দম বন্ধ হয়ে আসে না আমার!
.
মাথার উপর সাঁই সাঁই করে ফ্যান ঘুরছে।অথচ এর মধ্যেই সে ঘামছে।ভাবছিলাম, ঠিক ভাবছিলাম না ; মনে হচ্ছিলো ঘামগুলো মুছে দেই।বেচারা এতো কষ্ট করে রোজ তিন বেলা আমায় তুলে তুলে খাওয়ায়।কিন্তু আমি তা দিবো না, সে আমার প্রশ্নের জবাব দেয় না।যখনই কিছু জিজ্ঞাসা করেছি কেন আমি বন্দি,কেন আমায় এভাবে আঁটকে রাখা হয়েছে – সে তার কোন জবাব দেয়নি।তার ঘাম মুছে দেয়ার আমার তো কোন দায় নেই।আর দিবোই বা কী করে? সে তো রোজ তালা খুলে ঘরে ঢুকেই সবার আগে কালো কাপড়ে আমার হাত জোড়া বেঁধে ফেলে।কতো করে বারণ করি কিছুতেই আমার কথা শোনে না।
.
আমি হা করছি আর সে ভাতের লোকমা তুলে দিচ্ছে আমার মুখে।ইচ্ছে করছে তার আঙ্গুলে দেই বসিয়ে এক কামড়।খাইয়ে দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমার ঠোঁট থেকে লেগে থাকা ভাত সরিয়ে দিচ্ছে। কপালের উপর থেকে বেয়ে আসা চুলগুলো বার বার নাকের উপর এসে সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছিলো।বললাম,নাক চুলকে দিতে।আলতো করে নাকও চুলকে দিলো।আমার ওড়না পড়ে যাচ্ছে কাঁধ থেকে।বললাম, ওড়না তুলে দিতে।কিছুটা লজ্জা পেয়ে হলেও সে আমার ওড়না তুলে দিলো।তবে তার চোখে- মুখে বিরক্তির ছাপ দেখে বোঝাই যাচ্ছিলো আমি তাকে বেশ জ্বালাচ্ছি।জ্বালাবোই তো, আমি তো অমনই।
.
এতোক্ষনে খাওয়া প্রায় শেষ।বললাম,মুখ মুছে দিতে।সে আমায় নিজে নিজে মুছে নিতে বললো।কিন্তু আমার দুই হাত তো সে নিজেই বেঁধে রেখেছে। আমি নিজে মুছবো কী করে!বলাতে একটা টিস্যু দিয়ে আমার মুখ মুছিয়ে দিয়েই সে চলে যাচ্ছে। আমি ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছি। সে আমায় বেঁধে রাখলেই বা কি! সারাদিনে নিদেন পক্ষে একটা মানুষের মুখ তো দেখতে পাই।

আমি তাকে পেছন থেকে একবার ডাকলাম।এই যে শুনছেন? সে কিছুটা থমকে গিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ডাকার কারণ জিজ্ঞাসা করলো।অনুরোধ করে আবার সেই প্রশ্নটা করলাম।কেনো আমায় এইভাবে এই একলা ঘরে বেঁধে রাখা হয়েছে।সে এক পা, দু পা করে আমার কাছে এগিয়ে এসে নিচু গলায় ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বললো।আমার বুকের মধ্যে কেঁপে উঠলো।কেমন এক ছটফট অনুভূতি হচ্ছে।ধপাস!!! শব্দে দরজাটা লেগে গেলো।আবার আমি আধো আঁধারের এই একলা ঘরে।কানের মধ্যে ধপ ধপ করে বাজতে লাগলো, চুপ!!!!!!! চুপ!!!!!!! চুপ!!!
.
ভেন্টিলেটার থেকে ছুটে আসা সূর্যের আলো জানান দিচ্ছে এখন সকাল হয়েছে।আমি বিছানাতে উঠে বসলাম।নিজের জামা- কাপড় ঠিক করলাম।কারণ, কিছুক্ষনের মধ্যেই ওই ছেলেটা চলে আসবে সকালের খাবার নিয়ে।আর এসেই তো… উফ! ভাবাই যায় না।কষে আমার হাত জোড়া বাঁধবে।আমি যেন এক খুনের আসামি হ্যান্ডকাফ পরিয়ে সেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।আচ্ছা, আমি কি একটা পুরুষের হাত থেকে পালিয়ে যেতে পারবো?তাই কি যাওয়া যায় নাকি? কেনো যে সে এভাবে বেঁধে রাখে ,বুঝি না।
.
ভাবতে ভাবতেই দরজার খুটখাট শব্দ পেলাম।তালা খুলে ক্যাঁচ শব্দে ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো সে।আমি চুপচাপ বসে আছি।সে তার পকেট থেকে কালো কাপড় বের করে যথারীতি আমার হাত জোড়া পিছন মোড়া করে শক্তভাবে বেঁধে ফেললো।আজ পুরো চার দিন আমি এই ঘরটায় বন্দি।গত চারদিনে এই ছেলেটিকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পাইনি আমি।আজ আমি তার নাম জিজ্ঞাসা করলাম।সে আমায় ধমকের সুরে চুপ করিয়ে দিলো।নাম জানা থাকলে ডাকতে সুবিধা হয়।এই তো।আর তো কিছু না।বুঝিয়ে বলাতে সে আস্তে করে উত্তর দিলো – ত্রিভূজ।
.
এবার আমার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার যোগাড় হলো।ত্রিভূজ আবার কারও নাম হয় নাকি? প্রশ্ন করাতে সে ধমক দিয়ে বললো কথা কম বলতে।আমিও হাসি থামিয়ে চুপ হয়ে গেলাম।কিন্তু চোখের কোণে ভয়ের বদলে হাসির রেশই রয়ে গেলো।হবেই তো।আমি কাউকে ভয় পাই না।এ আমার আজন্মের স্বভাব।
.
চলবে…..

[রিভলভার- ওয়াহিদা সুলতানা লাকি]

Comments

comments