রিভলভার-৩|| ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

0

[পর্ব-৩]
.

বিষাদ থেকে মুক্তি দিবি?
. — রেহনুমা বিন্দু
.
বিষাদ আমায় জাপটে ধরে ডুবিয়ে মারে,
বল না তারে, দিক না ছেড়ে এ আঁধারে!
.
ঠাঁই হারিয়ে যাই তলিয়ে ডুব সাঁতারে
বিষাদ তবু কাছে এসে জড়িয়ে ধরে।
.
বিষাদ থেকে বল না আমায়,উতড়ে দিবি?
একটুখানি সুখের দোলায়
দোল দুলুনী সুখটা দিবি?
.
পা জড়ানো বিষাদ ছেড়ে তুই জড়াবি,
বুকের পাশে ঠাঁই করে তুই, থাকতে দিবি?
.
চুল ছুঁয়ে তোর পরশ দিয়ে গন্ধ নিবি,
মুখ লুকালে চিবুক ছুঁয়ে লাজ ছাড়াবি।
.
বল না,আমায় সারা জীবন রাখবি কাছে?
ঝড়- ঝাপটা যতই বলিস আসুক কাছে!
.
ছাড়বি না তো বিষাদ সিন্ধু কারাগারে?
দেখ না, বুকে তোর জন্যই হৃদয় আছে।
.
বিষাদ থেকে বল না,আমায় মুক্তি দিবি?
ডুব সাঁতারের তলা থেকে উতড়ে দিবি?
.
বুক পেতেছি,কাছে এসে বল হারাবি?
বিষাদ থেকে বল না,আমায় মুক্তি দিবি?
.
কবিতার মর্মার্থ বুঝতে বাকি রইলো না ত্রিভূজের।কিন্তু এমন বিষাদজড়া লেখার কারণ নিয়ে তার মন খানিকটা দ্বিধায় পর্যবশিত হলো।সে নিজের মনে অংক কষতে শুরু করলো আজ ছয়দিন যাবৎ কিডনাপিং হওয়া মানুষটার স্বামী কি সত্যিই তাকে খুঁজছে না?
.
আমি জানি না,ঠিক কতোক্ষন ত্রিভুজ আমার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়েছিলো।শুনেছি,মেয়েরা ঘুমুলে নাকি সারামুখ শরীর সবখানে মায়ার আভা আদরের শীতল পাটি বিছিয়ে দেয়।তাতে যে- ই স্পর্শ করবে শীতলতায় পূর্ন হবে দেহ,অন্তর,আত্মা।
.
হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে চোখ খুলে ত্রিভূজকে দেখে আমি হকচকিয়ে উঠে বসলাম।দ্রুত নিজের শরীরের কাপড় ঠিক করলাম।ভয় লেগে উঠলো এতো রাতের এই একলা ঘরে ও যদি আজ স্পর্শ করতো এই ঘুমের ঘোরে! আমি জানি আমার তখন কিছুই করার থাকতো না।শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ত্রিভূজের প্রবেশকে আমি আটকাতে পারতাম না।কি হতো তখন?আমিও কি তবে নেশায় মেতে উঠতাম অথবা এলোমেলো হতাম? নাকি হাতের কাছে রাখা কাঁচের গ্লাসটা দিয়ে ত্রিভূজের কপালটা ফাটিয়ে দিতাম? যদি ও রক্তাক্ত হতো অথবা ব্যাথায় জ্ঞান হারাতো তবেই তো আমার পালিয়ে যাওয়া সহজ হয়ে যেতো।সজোরে আঘাত করার মতো তেমন কিছুই এই ঘরে দেখি না কেবল একটা ছোট্ট খাট,একটা ড্রেসিং টেবিল, আর একটা চেয়ার- টেবিল ছাড়া।
.
আচ্ছা, আমি তো এটাও করতে পারি যখন দরজায় ত্রিভূজের শব্দ পাবো, সংগোপনে দরজার পেছনে চুপচাপ লুকিয়ে থাকবো।আর ঘরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই পেছন থেকে কাঁচের গ্লাসটা দিয়ে ওর মাথায় দিবো কষিয়ে এক ঘা।ব্যাস! রক্তাক্ত ত্রিভূজ লুটিয়ে পড়লেই আমি তখন পালিয়ে যাবো।
.
ছি! ছি! এসব তখন থেকে কি ভাবছি আমি।না,না। ত্রিভূজকে আমি আঘাত করতে পারবো না ।ওর জন্য গত কয়দিনে কেমন একটা মায়ার টান পড়ে গেছে আমার।তাহলে আমার পালাবার উপায়? কিডন্যাপ হয়ে শত্রুর জন্য বুকের মধ্যে মায়ার আনাগোনা হচ্ছে,জানি না এসব কি হচ্ছে আমার।ধ্যাত! আবার কিসব ভাবছি।
.
– কখন এলে? শব্দ পাইনি কিন্তু। অনেক দিন পর আজ বহুক্ষণ ঘুমালাম।

– জ্বি,দেখলাম।

– কি দেখেছো?

– কিছু না।আসুন, হাত বেঁধে দেই।

– অমন করে কাছে ডাকো যেন ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছো।

– কি?

– কিছু না।এমনিই নিজের সাথে বকবক করলাম।আমি পালাবো না।ভয় পেও না।হাত বাঁধতে হবে না।

– বস্ এর হুকুম।

– তোমার বস্ খুব বড় মাপের গুন্ডা।তাই না ত্রিভূজ?

– লেখাটা পড়লাম।

– উত্তর দিলে না যে?

– কথা কম বলুন।

– তাহলে লেখাটা পড়ে কি বুঝলে ওটাই বলো।নাকি তাও বলবে না?

– আপনার মধ্যে জমিয়ে রাখা চাপা নিঃশ্বাসটা এই ঘরে থেকে আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
.
ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার।আজ ত্রিভূজকে কেমন যেন আরও বেশী শান্ত দেখাচ্ছে।
.
– হাত দিন।সময় নষ্ট হচ্ছে।

– এই যে ঘুমের ঘোরে এই একলা ঘরে আমায় পেয়েও তুমি সংযত রইলে তোমার মধ্যে কি নেশা জেগে ওঠেনি?

– ছি!

– হা হা হা হা।হাসি পাচ্ছে জানো?

-হাসি থামান।

-অন্য কেউ হলে সেটাই করতো,যেটা আমি মিন করেছি।কিছু মনে করো না।এটাই হয় সাধারণত।আর তুমি দস্যু হলেও সেই সাধারণের বাইরে বাস করো।

– আমি ফুলকে দাগহীন দেখতেই ভালোবাসি,দাগ দিতে নয়।

– বাহ! এই প্রথম চমৎকার কিছু বললে,এর আগে যা কিছু বলেছো সব অদ্ভুত ছিলো,গম্ভীর ছিলো।

– হা করুন।ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

– আজ আমি নিজেই খাই?

– না।আমি যতোক্ষন এই ঘরে আছি ততোক্ষন আপনার হাত বাঁধা থাকবার নির্দেশ দেয়া আছে।
.
ত্রিভূজের মনটা আজ সত্যিই বড্ড বিষন্ন দেখাচ্ছে।জানি না সেটা কি ওর কোন ব্যক্তিগত কারণে নাকি লেখাটা পড়ার পর থেকে।খাওয়া শেষ হতে হতেই ওকে প্রশ্ন করলাম,

– আমার সেই মজার গল্পটা শুনবে না?

-আজ রাতে না।

– তবে কি কাল রাতে শুনবে?

– আচ্ছা।

– তোমার আনা জামাটা পরে আমায় কেমন লাগছে বললে না যে?

– সুন্দর।

– নিজ থেকে বললে না যে?

– আপনাকে কিডন্যাপ করে এখানে আনা হয়েছে।আপনি এখন আমার হাতের বন্দি।আপনার ভয় লাগে না? যদি গুলি করে দেই?

– না, আমার ভয় লাগে না।লেখকদের ভয় থাকতে নেই।আচ্ছা, তোমার কি খুব কাছের কেউ নেই? যতোটা কাছের মানুষের কাছে নিজের কিছুটা বিষন্নতা জমা রাখা যায়?

– না, নেই।
.
বুঝতে পারলাম, ত্রিভূজের মুখ আমার কাছ থেকে কিছু লুকোতে চাইলো।চাইবেই তো।আমি কে, আর এসব কথা আমার জানতে চাওয়াও উচিৎ নয়।নাহ! বন্দি থেকে থেকে এবার বোধ হয় মাথাটা আমার যাচ্ছে।
.
– আসি, বেশী রাত জাগবেন না।শরীর খারাপ করবে।

– বন্দি জীবনের আর শরীর খারাপ!

– তবুও।

– মুক্তিপনের টাকাটা পেলে?

– জানি না।

– বস্ কি বলেছে? তোমরা আর কতোদিন আটকে রাখবে আমায়? আমার স্বামীর অনেক টাকা,অনেক।দেখে নিও, ও নিশ্চয়ই টাকাটা দিয়ে দেবে।

– দিলে এখনও আটকে রাখতে হচ্ছে কেনো?

– তা তো জানি না ত্রিভূজ।
.
মাথার মধ্যে জট লাগতে শুরু হলো আমার।তাই তো, রাকিব টাকাটা দিচ্ছে না কেনো?তবে কি রাকিব চায় না আমি বাড়ি ফিরি? ছয়টা দিনে ওর মধ্যে কি একবারও সে হাহাকার আসেনি? ত্রিভূজ টিফিন ক্যারিয়ার গুছাচ্ছে।কিছুই ভালো লাগছে না আমার।আমি ওর কাজের দিকে তাকিয়ে আছি ধ্যান মগ্ন হয়ে।কিইবা করার আছে আমার! ভীষন অসহায়ত্বের চোরাবালিতে ক্রমশ যেন ডুবে যেতে থাকলাম আমি।

.
রাত হয়ে গেছে। এর মধ্যে কখন যেন শরীরে উষ্ণতা বেড়েছে টেরই পাইনি।সম্ভবত অনেক দিন পর অনেক্ষন ভিঁজে ভিঁজে শাওয়ার নেওয়াতেই এ অবস্থা হয়েছে। শুয়ে থেকেও কাঁপছিলাম।মাথাটা ঝিমঝিম করছিলো।ত্রিভূজ বোধ হয় খাবার নিয়ে এসেছে।দরজার শব্দ পাচ্ছি।ঘরে ঢুকে টেবিলে খাবারের ব্যাগটা রেখে ও আমাকে উঠতে বললো।এখনও আমি শুয়েই আছি।কিছুতেই উঠে বসতে পারছি না।মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী শুদ্ধ ঘুরছে।আমার চোখ খোলা দেখেই ত্রিভূজ আমায় আবার ডাকলো,
.
– ম্যাম…. উঠুন।খেতে হবে এখন।

– খাবারগুলো নিয়ে যাও ত্রিভূজ।আমার ভালো লাগছে না।আজ খাবো না।

– আপনি বললেও আমি শুনবো না।উঠুন।

-না, আমি খাবো না।প্লিজ জোর করো না।

– দেখুন, কথা কম বলুন।আমি যা বলছি,আপনাকে সেটাই করতে হবে।

.
আমার চোখ গড়িয়ে টপ টপ জল পড়ছে।ত্রিভূজ তা লক্ষ্য করে এবার কাছে এসে দাঁড়ালো।বোঝার চেষ্টা করছিলো কেনো আমি কাঁদছি।আমাকে পড়তে পারা ত্রিভূজের পক্ষে সম্ভব নয় আমি জানি।ত্রিভূজ জানে না, আমার উষ্ণতার খবর।আমি কথায় কথায় সেদিন রাকিবের অফিসের এড্রেস বলেছিলাম,রাকিব সম্পর্কে অনেক কিছুই শেয়ার করেছিলাম ত্রিভূজের কাছে।আর তার পর থেকেই কেমন বদলে গেছে ছেলেটা।বিষন্নতায় ওর নিচু গলার ধমকগুলোও হারিয়ে গেছে অচেনায়।
.
– কি ভাবছেন? দেরি হয়ে যাচ্ছে।উঠুন।হাত দিন।

– ত্রিভূজ, আজ যদি আমায় না ও বাঁধো তবু আমার পালাবার ক্ষমতা নেই।

– ক্ষমতা কোথায় থাকে জানেন ম্যাম?

– কলমে।

– ভুল।

– তাহলে?

– রিভলভারে।

– মানে?

– খুব সহজ।
.
ত্রিভূজ নিজের পকেট থেকে চকচকে একটা রিভলভার বের করে আমার মুখের সামনে ধরলো। তাতে কিছুটা স্তব্ধ হলেও ভয় পাবার অভ্যাস আমার নেই।রিভলভারের কিছুটা চকচকে স্টেইনলেস স্টীল এর ঝলকানি আমার চোখে এসে লাগলো।চোখ বন্ধ করে ফেলতেই ত্রিভূজ রিভলভারটা আমার মুখের উপর থেকে সরিয়ে নিলো।
.
– ভয় পেলেন ম্যাম?

– মোটেই না।

– যদি গুলি করে দেই?

– দিলে দেবে।আজ সাত দিন আমি।বন্দি।এতোদিনে এটুকু আমি বুঝে গিয়েছি আমি বাড়ি ফিরি রাকিব তা চায় না।চাইলে নিশ্চয়ই টাকাটা দিয়ে আমায় ছাড়িয়ে নিয়ে যেতো।

-আচ্ছা ম্যাম, ধরুন আপনার আছে কলম।আর আপনার স্বামীর আছে রিভলভার।এবার বলুন তো কে বেশী শক্তিশালী?
.
আমি চুপ করে রইলাম।কারণ, আমার শক্তিশালী কলমের কোন স্বাধীনতা নেই।আমি যা চেয়েছি, তা পারিনি।রাকিব ওর শক্তি ঠিকই ব্যাবহার করে নিলো।আমি পারলাম না রুখে দিতে।আমার চোখ গড়িয়ে আবার জল পড়ছে।আমি হেরে গেলাম।
.
– কাঁদবেন না ম্যাম।উঠুন, খাইয়ে দেই।

– ত্রিভূজ, আমি হেরে গেলাম।

– আপনি কি তবে বুঝেছেন রিভলভারের শক্তি বেশী? রিভলভারের কাছে হেরে গেলেন?হাহ! ম্যাম।

.
ত্রিভূজ আমার আরেকটু কাছে এসে হাত ধরলো বেঁধে দেয়ার জন্য।ওমনি চমকে উঠে চোখে – মুখে ভুত দেখার মতো রেখা টেনে বললো,
.
– সে কি? আপনার তো জ্বর।এই ঘরে সারাদিন একা একা জ্বরে পুড়েছেন।ওহ মাই গড!

– প্লিজ! তোমার বস্ কে জানিও না।

– শর্ষের মধ্যে ভুত। দেখি, বালিশেএকটু হেলান দিয়ে বসুন তো। খাইয়ে দেই।খালি পেটে শরীর আরও খারাপ করবে।

– হাত বাঁধবে না?

– না।

– যদি পালিয়ে যাই?

– আর পারবেন না ম্যাম।একজনের বিনিময়ে একজন হতে পারে।

– মানে?

– ওসব আপনি বুঝবেন না।চুপ করুন।

.
ত্রিভূজ কালো কাপড়ে আমার হাত দুটো না বেঁধে জলে ভিঁজিয়ে আমার কপালে জ্বর পট্টি দিয়ে দিলো।উফ! এতোক্ষনে চোখ দুটোতে যেন শান্তি ফিরে এলো।জ্বরে জ্বলে যাচ্ছিলো একেবারে।আমি চুপ করে শুয়ে আছি।ও বার বার আমার জ্বর পট্টিটা ঠান্ডা জলে ধুয়ে আমার কপালে আর চোখে দিচ্ছে।কিন্তু আমাকে তো এখান থেকে পালাতেই হবে, সেটা যে করেই হোক।যে আমায় এমন করে আগলে রেখেছে আমি কি পারবো তাকে খুন করে হলেও পালাতে?
.
চলবে……..

[রিভলভার- ওয়াহিদা সুলতানা লাকি]

Comments

comments