রিভলভার-৪ || ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

0

[পর্ব-৪]
.

জ্বর পট্টি দিতে দিতে আমি কখন যেন নিরব হয়ে গিয়েছি নিজেও টের পাইনি।সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।এতোক্ষন ত্রিভূজ আমায় ডাকেনি।আমার উষ্ণতা কিছুতেই কমছে না।আমি আস্তে আস্তে চোখ খুললাম।কেমন যেন গা গুলিয়ে আসছে আমার।চোখ মেলেই মাথার পাশে ত্রিভূজকে দেখতে পেয়ে খানিকটা অবাকই হলাম।ও এখনও যায়নি! কোন রকমে উঠে বসতে গেলাম, ত্রিভূজ বাঁধা দিলো।খুব ইতস্তত বোধ হচ্ছে ওর সামনে শুয়ে থাকতে।
.
ত্রিভূজ আমার কপালে হাত রেখে কী মনে করে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো।এক ছুটে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।আমি দরজায় তালা লাগাবার শব্দ পেলাম।ও অমন করে কেন বেরিয়ে গেলো এতো কিছু এখন ভাবার মতো আর শক্তি পাচ্ছি না ব্রেইনে। শরীরটা আরও বেশী খারাপ লাগছে।কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না কিভাবে যে কী করবো, কেমন করে পালাবো এখান থেকে।
.
ঠিক কতোক্ষন পর ত্রিভূজ ফিরেছে আমি জানি না।ততক্ষনে যে অনেকটা সময় গড়িয়ে গেছে এটুকুও বুঝিনি আমি।ঘরে ঢুকেই ও আমাকে কানের কাছে গিয়ে ডাকলো।ও ধরে নিলো আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।অথচ, আমি ওর সবকটা ডাকই শুনতে পাচ্ছি।অনেক চেষ্টা করেও কোনভাবে চোখ মেলতে পারছি না।ত্রিভূজ আমায় ঠিক কখন থেকে ডেকে চলেছে তা অবশ্য জানি না।এবার ত্রিভূজের মনে খটকা লাগলো।
.
– ম্যাম…… ম্যাম…….ম্যাম….শুনতে পাচ্ছেন?ম্যাম ঘুমিয়ে পড়েছেন? ম্যাম……
.
ত্রিভূজের উৎকণ্ঠা তুঙ্গে ভাসতে শুরু করলো।একে তো আমায় সুস্থ রাখার দায় বব্ধতা,তার উপর আমার প্রতি ওর এক অচেনা মায়ার অনুভূতির টান।যা আমি ঠিকই বুঝতে পারি।
.
– ম্যাম, আমি আপনার জন্য ঔষধ আনতে গিয়েছিলাম।উঠুন আগে ভাত খেতে হবে।প্লিজ! চুপ করে থাকবেন না।ম্যাম……..
.
এতোগুলো ডাকের পরেও ত্রিভূজ আমার কোন সাড়া না পেয়ে কিছুটা ভরকে গেলো।এবার ওর দুই হাত দিয়ে আমার কাঁধ ধরে সজোরে ঝাঁকাতে লাগলো।এই মুহূর্তে আমার সেন্স নেই।অতিরিক্ত উষ্ণতায় আমি সেন্স হারিয়েছি। ত্রিভূজ ভয় পাচ্ছে।ও আমায় ঝাঁকাচ্ছে আর ডেকে চলেছে।
.
-ম্যাম…. ম্যাম… বিন্দু… বিন্দু শুনতে পাচ্ছেন? বিন্দু…..
.
আমি কি মারা গিয়েছি নাকি জ্ঞান হারিয়েছি বোঝার জন্য ত্রিভূজ নিজের ডান হাতের আঙ্গুলগুলো আমার নাকের সামনে স্পর্শ করে অনুভব করার চেষ্টা করলো নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা।নাহ! আমি বেঁচে আছি।নিশ্চিত হয়ে ও ওয়াশ রুম থেকে বালতি ভরে পানি এনে আমার মাথায় ঢালতে শুরু করলো। আমি সেন্স ফিরে পেলাম।
.
ও খুব যত্ন করে বিছানায় দুটো বালিশ হেলান দিয়ে আমায় বসিয়ে দিলো। খানিকটা ভাত খাবার পর আমায় ঔষধ খাইয়ে দিলো।সারা রাত জেগে থেকে মাথায় জ্বর পট্টি দিতে থাকলো। রাত ভর জেগে থেকে কি কি ভেবেছে নাকি আমার উষ্ণ মুখের নকশা মুখস্ত করেছে আমি তা জানি না।যখন আমার ঘুম ভাঙ্গলো পাশ ফিরে দেখি চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে আছে আকাশী রঙ্গের টি শার্ট পরা মানুষটা।আকাশের মতো উদারতা নিয়ে গুন্ডাদের দলে নাম লিখিয়েছে কোন অভিমানে তাও আমার জানা হয়নি।

.
পাখিদের কিঁচির মিচির শব্দই জানান দিচ্ছে ভোর হয়ে গেছে।ভ্যান্টিলেটর এর সরু সরু ছিদ্র দিয়ে আলোক রশ্মি জোর করেই ঢুকে যাচ্ছে ঘরের আনাচে কাঁনাচে।আমি নিজে নিজেই উঠে বসলাম।এখনও মাথা ঘুরছে।আমার নড়াচড়ার শব্দে ত্রিভূজের ঘুম ভেঙ্গে গেলো।
.
– এখন শরীর কেমন লাগছে বিন্দু?
.
উত্তরের বদলে আমি রীতিমতো অবাক হলাম।এই প্রথম ত্রিভূজ আমার নাম ধরে এমন করে ডাকলো যেন কতোটা কাছের কেউ একজন আমার যন্ত্রনার খোঁজ নিচ্ছে।মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন যোজন যোজন ভৌগলিক দূরত্বে অবস্থান করেও হৃদয়ের গভীরে বাস করা হয়।আবার এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন পাশাপাশি বালিশে অবস্থান করেও জানা হয় না মৃত্যু পাশের মানুষটির কাঁধে নিঃশ্বাস ফেলে যায়।পাশের বালিশটিও জানে না তার দোসরের গল্প।একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার বুকের গভীর থেকে।
.
– কি হলো? চুপ করে কি ভাবছেন? বিন্দু….

– হু…. না।কিছু না।
কালকের চেয়ে ভালো আছি।আমার জন্য অনেক কষ্ট করলে।সারাটা রাত এখানেই ছিলে।তাই না?

-জ্বি

– এভাবে এই চেয়ারে বসে রাত পার করেছো।এবার যাও নিজের যত্ন নাও।পারলে আমায় ছেড়ে দেবার ব্যবস্থাটা করো।রাকিবকে আবার একটু ফোন করো।

-উফ! বিন্দু! চুপ করুন।

– হঠাৎ রেগে গেলে যে?

– স্যরি।

– খুব জ্বালাচ্ছি আমি।তাই না?

– একটা কথা জানেন, দিনের কোন কোন অংশের যন্ত্রনা সারা দিন বেঁচে থেকে অন্ধকারকে স্বাগত জানাবার প্রেরণা যোগায়।

– অদ্ভুত!

– জ্বি।সত্যিই আমি অদ্ভুত। যাই খাবার নিয়ে আসি।আপনি উঠে ফ্রেস হয়ে নিন।ঔষধ খেতে হবে।

– হু।

– আর শুনুন…

– হু….

– খুব সাবধানে।হু?

– ঠিক আছে।
.
বিছানা থেকে ধীরে ধীরে পা দুটো নিচে নামালাম।পায়ের পাতা ফ্লোর স্পর্শ করতেই যেন ছ্যাৎ করে উঠলো।তার মানে এখনও অনেক জ্বর আছে আমার শরীরে।সাহস করে শাওয়ার নিয়ে নিলাম।ঘরে এসে জানালা খুলে বিছানায় শুয়ে বাইরের আকাশে তাকিয়ে আছি।বিস্তীর্ন আকাশের বুক জুড়ে ছোঁপ ছোঁপ মেঘ যেন তার উদার বুকেও ব্যাথার ইঙ্গিত দিয়ে যায়।
.
দিন গড়াচ্ছে সবকিছুই ক্রমশ জটিল হয়ে আসছে আমার কাছে।পুরোপুরি সুস্থ হবার জন্য অপেক্ষা করে শত্রুর ছাদের তলায় দিন- রাত্রি যাপনের সত্যিই কোন মানে হয় না।আমি অসুস্থ বলে আজ ত্রিভূজ আমায় বাঁধবে না। এটাই সুযোগ।
.
পালাতে হলে সবার আগে ত্রিভূজকে নিরস্ত্র করতে হবে।মায়া করাটা এখন সম্পূর্ন বোকামো হবে।ওকে আমি বিশ্বাস করবো কোন অযুহাতে? হাজার হলেও ত্রিভূজ কিডন্যাপার দলেরই একজন।এই কেয়ারিং এর মধ্যে যদি কোন উদ্দেশ্য লুকায়িত থাকে? ওর পকেটের ওই রিভলভারটা আমার চাই। ইয়েস!! এই মুহূর্তে রিভলভারেই সব শক্তি আমার মতো নিরস্ত্র অসহায় লেখিকার জন্য।
.
খাবার রেডি করে ও যখন হাত ধুতে ওয়াশ রুমে যাবে তখনই কাজটা সারতে হবে।রোজকার মতো আজ আর আমার হাত বাঁধা থাকবে না।এক ফাঁকে আমাকে রিভলভারটা লুকিয়ে ফেলতে হবে।এরপর সুযোগ বুঝে ওর মাথার পেছনের অংশে সজোরে আঘাত।আর তারপর আমার ছুটে বেরিয়ে যাওয়া।মোটেই দেরি করা চলবে না।অপেক্ষা করে আছি কখন সে আসবে।
.
ভাবতে ভাবতেই ত্রিভূজ খাবার নিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো। এমন কিছু করা যাবে না, যা আমার চেহারাতেও প্রকাশ পায় আর ত্রিভূজ সেটা আন্দাজ করতে ফেলে।রিভলভারটা পকেট থেকে টেবিলে নামিয়ে ও হাত ধুতে গেলো।আমি জানি, ও এখন আমায় বিশ্বাস করে।কিন্তু এখন ওকে আমার বিশ্বাস করাটা একদম ঠিক হবে না।আমি আস্তে করে উঠে গিয়ে রিভলভারটা তুলে বালিশের নিচে লুকিয়ে রেখে দিলাম।ত্রিভূজ আমায় খাইয়ে দেবার জন্য প্লেটে খাবার নিয়ে আমার মুখের সামনে এসে বসলো।মুখে খাবার তুলে দিলেও আজ আর গলা দিয়ে খাবার নামছে না আমার।আমি সুযোগ খুঁজছি ওকে আঘাত করার। আমার মনটা ভীষন ছটফট করছে।বুকের মধ্যে ধুকপুক করছে। আমি তো কাউকে ভয় পাই না।তবে কেন আমার এমন হচ্ছে!
.
– কি ব্যাপার? খেয়ে নিন।আজ খাচ্ছেন না কেনো? সুস্থ না হলে আপনাকে বাঁচাবো কী করে?

-ধমক দিও না। কিডন্যাপ করে আটকে রেখে এখন বাঁচাবার কথা বলছো?

– জ্বি বলছি।মানুষ কি যা ঘটে তার সবটা দেখতে পায়? আমি যা জানি, আপনি যদি তা জানতেন তাহলে….

– তাহলে?

-কিছু না।হা করুন।

– অর্ধেক কথা একদম ভালো লাগে না ত্রিভূজ।

– চুপ করুন।আপনি এখন অসুস্থ।

– কি হবে চুপ করালে? কোন স্বার্থে তুমি আমার এতো যত্ন করছো?

– বিন্দু!!!!!!
.
কোন মতে ঢোক গিলে আমি ত্রিভূজের ধমক হজম করলাম।নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছি। অর্ধেকটা খেয়ে খাবারটা ফিরিয়ে দিলাম।ত্রিভূজ হাত ধুতে বেসিনে গেলো।আমিও নিঃশব্দে ওর পেছন পেছন গেলাম।দাঁত চিপে বুকের মধ্যে সাহস আনলাম।আর কিছু ভাবার সময় নেই।ত্রিভূজের মাথার পেছন বরাবর রিভলভার দিয়েই দিলাম বসিয়ে এক ঘা।ওমনি ঠাসসসসসসস!!!! করে বিকট শব্দে ফায়ারিং হয়ে গেলো।
.
চলবে……..
[রিভলভার – ওয়াহিদা সুলতানা লাকি]

Comments

comments