রিভলভার-৫ || ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

0

[পর্ব-৫]
.
ফায়ারিং এর শব্দে আমি নিজেই হতভম্ব হয়ে গেলাম।ব্যাপারটা কি হলো? কারণ, ত্রিভূজের মাথার পেছনে সজোরে ঘা বসাবার সময় ও আগেই আমাকে বেসিনের আয়না দিয়ে দেখে ফেলেছিলো আমি তা বুঝতে পারিনি জ্বরের ঘোরে। তাই একশনের সময় ও আমার হাতটা মুচড়ে খপ্ করে ধরে ফেলে।আর তখনই রিভলভারের স্ট্রাইকারে চাপ লেগে উপরের দিকে ফায়ারিংটা হয়ে যায়।ভাগ্যিস কারও গায়ে লাগেনি।আমি তো ওকে খুন করতে চাইনি, পালাবার জন্য শুধু জ্ঞানশূন্য করতে চেয়েছিলাম।
.
ত্রিভূজ আমার হাত থেকে রিভলভারটা হ্যাঁচকা টানে নিয়ে নিজের পকেটে চালান করে দিলো।ওর পুরো মুখ রাগে রক্তিম বর্ন ধারণ করেছে। সেই প্রথম দিনের মতো চোখ কটমট করে আমার দিকে তাকাচ্ছে।কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার পুরো পৃথিবী অন্ধকার করে ও দিলো বসিয়ে কষে এক চড়। আমি গালে হাত রেখে স্তব্ধ হয়ে আছি, কাঁপছি।ত্রিভূজ আমার গালে চড় মারলো?
.
ও আমার হাত ধরে ছেঁচড়ে নিয়ে এক ধাক্কায় বিছানাতে ফেলে দিলো।একে তো অসুস্থ শরীর তার উপর ওর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে এবার বুঝি আমার শরীরের অলগলি সব চিনে নেবে সে।আমার চোখ ক্রমশ বিস্ফোরিত হচ্ছে।ও ধীর পায়ে আমার বিছানার দিকেই এগিয়ে আসছে।এবার ব্জ্র কঠিন হস্তের দুই আঙ্গুলে ত্রিভূজ আমার চিবুক চেপে ধরে বললো,
.
– পালাতে চেয়েছিলে? পালাতে? হ্যাঁ??
পালাতে চেয়েছিলে তুমি ?? আমায় খুন করতে গিয়েছিলে?কার কাছে ফিরবার জন্য এতো আয়োজন? Who is he?? Answer me.
.
ওর এই রূপ আমি আগে কখনো দেখিনি।এভাবে গর্জনও আগে কখনো শুনিনি।ও আমার মুখের কাছে নিজের মুখ এগিয়ে নিয়ে আসলো।আজ আমি সত্যি সত্যিই ভীষন ভয় পাচ্ছি।ও আমার শরীর ছিঁড়ে খাবে না তো! ভয়ে আমার চোখ দুটো অনায়াসে বন্ধ হয়ে গেলো।ভ্রু কুঞ্চিত আর অধর কম্পিত হচ্ছে।
.
– তোমার ঠোঁট গুলো একটু ধার দেবে বিন্দু?

– মানে? কি করবে তুমি আমার ঠোঁট দিয়ে?

– কি করবো শুনবে? যাস্ট ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে সেলাই করে দিবো।যেন কথাই বলতে না পারো।নির্বোধ মেয়ে কোথাকার!!
.
আমাকে আবার একটা ধাক্কা মেরে ও বিছানার সামনে থেকে সরে গিয়ে জানালায় দাঁড়ালো।এতক্ষন তবে আমি ভুল ভাবছিলাম।জিন্সের পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে রেখে অদ্ভুত ভঙ্গিতে সিগারেট ধরালো।জানা মতে গত রাতে ত্রিভূজ খায়নি।আমার কাছেই তো ছিলো সারাটা রাত।সকালেও নাস্তা করেনি।এখন বাসি পেটে ধোঁয়া ওড়াচ্ছে জানালায় দাঁড়িয়ে।
.
আমি ধুম মেরে বসে আছি বিছানায়।হঠাৎ লক্ষ্য করলাম ত্রিভূজের চোখ লাল হয়ে গেছে।তার মানে ত্রিভূজ কাঁদছে।আমি যেন পুরো থ’ হয়ে গেলাম।বুঝে গেলাম, ও কিডন্যাপার দলের সদস্য হলেও আমার জন্য ওর মধ্যে ভিন্ন কোন অনুভূতি কাজ করে।

.
উঠে গিয়ে ওর পাশে এসে দাঁড়ালাম।ত্রিভূজের চোখ গড়িয়ে টপ টপ জলধারা পড়েই চলেছে। আমি কখনো কোন পুরুষকে এমন করে কাঁদতে দেখিনি।খুব বেশী আঘাত না পেলে পাহাড় সমান কষ্ট হজম করেও পুরুষ কাঁদে না।কেন যেন মনে হলো নিজের কিছু কথা ওকে জানানো প্র‍য়োজন। নিজে নিজেই বলতে শুরু করলাম নিজের একান্ত কথাগুলো……
.
বেশ কয়েক বছর হয়েছে রাকিবের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে।এর মধ্যে আমাদের কোন সন্তান আসেনি। আমি একটা পত্রিকা অফিসে আছি।নিজের মতো নিজের লেখা চালিয়ে যাবার পাশাপাশি ওখানে ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি।
.
একদিন রাতের ঘটনা বলি। রাকিব পি সি খোলা রেখেই বারান্দায় চলে যায় একটা ফোন আসাতে।আমি ওকে ডিনারের জন্য ডাকতে ঘরে এসে দেখি রাকিব নেই।ওর পি সি তে চোখ পড়তেই যা দেখলাম আমার মাথা ঘুরে উঠলো।রাকিব জানতো আমি তখন কিচেনে ব্যস্ত।আমি ওর ফোনের সব কথা শুনে বুঝে ফেলি ওপাড়ে ঠিক কি ধরনের কথা হচ্ছিলো।সব শুনে, দেখে যা বুঝেছি এটা ছিলো বড় ধরনের একটা ক্রাইম।পুরো বিষয়টা খুলে বলার মানসিকতা এখন নেই আমার।শুধু এতোটুকুই বলি,আমি রাকিবকে অনেক অনুরোধ করেছিলাম যা দেখেছি,যা শুনেছি তা থেকে ও যেন বেরিয়ে আসে।কিন্তু ও তাতে রাজি হয়নি।উপরন্তু, ও আমাকে ইনসিস্ট করে বিষয়টা চেপে যেতে।আমি রাকিবের কথা মেনে নেইনি। বাধ্য হয়েছি বিষয়টা নিয়ে একটা ক্রাইম রিপোর্ট লিখতে।ও আমাকে এই নিয়ে যথেষ্ট ফোর্স করে।ও যাতে ওখান থেকে ফিরে আসে সেজন্য আমি বেশ রাগও করলাম।লাভ হয়নি তাতে,কারণ রাকিবের সাথে আমার বন্ডিংটা খুব একটা ভালো না।যে যার মতো নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকি।
.
রাকিব জানে, আমি কাউকেই ভয় পাই না। বিষয়টা নিয়ে যদি না লিখতাম আমি নিজের নীতির কাছে বিবেক বর্জিত হতাম।আমি রিপোর্ট রেডি করেছি সেটা রাকিব টের পেয়ে যায়।ও আমাকে শেষবারের মতো বাঁধা দেয়,ফোর্স করে। কিন্তু আমিও সে বাঁধা না মেনেই সকালবেলা রিপোর্ট জমা দিতে রোজকার মতো অফিসের জন্য বের হয়েছিলাম।আমার সাথে কোন গাড়ি ছিলো না তাই রিক্সার জন্য দাঁড়িয়েছিলাম।কিন্তু অফিসে যাবার পথেই হঠাৎ একটা কালো গ্লাসের মাইক্রো বাস আমার সামনে এসে থামে।মাইক্রোবাসের দরজা খুলে একজন বেরিয়ে এসে আমায় মাইক্রোবাসে উঠতে বলে।আমি অবাক হতে থাকি এসব হচ্ছেটা কী।ওরা কথা বাড়ায় না।আমি অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরেই ওদেরকে ধমক দেই। কিন্তু আকষ্মিকভাবে ক্লোরোফর্ম যুক্ত একটা রুমাল আমার নাকে চেপে ধরতেই চারপাশটা কেমন ঘোলা আর অন্ধকার দেখি।তারপর চোখ খুলে দেখি আমি এই ঘরে একা বন্দি।
হাহ! দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরুচ্ছে এখন।কথাগুলো যতোক্ষন ধরে বলছিলাম ত্রিভূজ নিরব হয়ে শুনছিলো।যেন, ক্লাস সেভেনের ছাত্রকে অজানা অংক কষার কৌশল শিক্ষা দিচ্ছিলাম।
.
– বিন্দু….

– হু…

– রাকিব সাহেব দেশের একজন বড় মাপের শিল্পপতি।তাই না?

– হ্যাঁ ।সবাই তাকে চিনে।বললাম না, ওর অনেক টাকা? ও ঠিক ঠিক আমার মুক্তি পনের টাকাটা দিয়ে দেবে দেখে নিও।তোমরা ওর সাথে যোগাযোগ করো। জানি না, ও কেমন আছে, কি করছে।নিশ্চয়ই তোমরা রাকিবের সাথে যোগাযোগ রাখোনি।মুক্তিপনের টাকাটা পাবে কী করে তাহলে? ওর অনেক ক্ষমতা।আমাকে তোমরা কিডন্যাপ করেছো, জানতে পারলে তোমাদের অবস্থা খুব করুণ করে দেবে রাকিব।ভালো চাইলে, বস্ কে বলো আমায় ছেড়ে দিতে।
.
ত্রিভূজ জানালার গ্রীল ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।দেখেই মনে হচ্ছে ও কিছু একটা হিসেব মিলাতে চাইছে।হিসেবটা কোথায় যেন বার বার আটকে যাচ্ছে। বলতে চাইছে হয়তো অনেক কথাই।যে কথার আন্দোলন দলা পাঁকিয়ে গলার কাছ থেকে ফিরে যাচ্ছে গভীরে।ওর ফেলা ঘন নিঃশ্বাস আমায় ভাবিয়ে তুলছে।
.
ভাবছি, ওরা কি তবে রাকিবকে কোনরকম খবরই দেয়নি? নাকি ওরা আমায় মেরে ফেলবে? কার এতো বড় সাহস যে আমায় কিডন্যাপ করিয়ে এখানে আটকে রেখেছে? একবার যদি পালাতে পারি তার অবস্থা আমি শোচনীয় করে ছাড়বো। কিন্তু, ত্রিভূজকে দেখে কেন যেন আমার অন্য কিছু মনে হয়।ও হয়তো চায় না আমার ক্ষতি হোক।ও যা কিছু করছে তার সবই সম্ভবত বস্ এর হুকুমেই করছে।
.
– ত্রিভূজ….

– হু

– কি ভাবছো?

– কিছু না।

– সত্যি করে বলো তো কি ভাবছিলে? আমার কাজে আজ খুব আঘাত পেলে জানি। এছাড়া আমার আর কোন পথ ছিলো না এখান থেকে মুক্তি পাবার।
কথাগুলো শুনে তুমি কি কষ্ট পেলে?

– না।

– তবে?

– তোমার জন্য বড্ড করুণা হচ্ছে বিন্দু।ঠিক তোমার জন্য নয়; তোমার দুর্ভাগ্যের জন্য।

– জানি, এবার তোমরা আমায় মেরে ফেলবে।কারণ, আমি পালাবার এটেম্প নিয়েছিলাম।তোমাকে আঘাত করতে গিয়েছিলাম।

– আই এম এক্সট্রেইমলি স্যরি ম্যাম। ক্ষমা করুন আমায়। তাছাড়া নিজের অজান্তে কখন যেন তুমি করে বলে ফেলেছি।আমার মাথা ঠিক ছিলো না।

– আমার জীবন এখন তোমাদের হাতে বন্দি।করুণা কি সেজন্য?

– চুপ করুন।কিছু ভালো লাগছে না আমার।
.
অবাক হলাম কিডন্যাপার দলের সদস্যের আচরণে।শুরু থেকেই ওকে আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে।ওর আচরণে মনেই হয় না ও ওই দলের সদস্য।নিজের মতো করে এক্সট্রা কেয়ার নিচ্ছে আমার।যা কোন কিডন্যাপার দলের সদস্য করে না।ওর কথাতে মনেই হয় না আমাকে ওরা কিডন্যাপ করে এখানে আটকে রেখেছে।
তবে যে কোন উপায়ে হোক আমাকে তো পালাতেই হবে।
.
-বিন্দু, আপনি যা জানেন না,এখন আমি তা জানি।

– কি জানো তুমি?

– কে আপনাকে এখানে আটকে রেখেছে,সেটা।

– এক্ষুনি বলো
কে আটকে রেখেছে আমায়?

-বলছি…।

.
.
চলবে…….

পর্ব:১

রিভলভার || ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

পর্ব:২

রিভলভার || ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

পর্ব: ৩

রিভলভার-৩|| ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

পর্ব:৪

রিভলভার-৪ || ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

[রিভলভার – ওয়াহিদা সুলতানা লাকি]

Comments

comments