রিভলভার-৬ || ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

0

[পর্ব- ৬]
.

– কি হলো বললে না?

– বিন্দু, কিছু কিছু পরিচয় গোপন থাকা নিজের জন্যই মঙ্গলময়।

– মানে কি ত্রিভূজ? তাহলে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।আমি তোমাকে মারতে গেলাম অথচ তুমি আমাকে মেরেই কাঁদলে কেনো? একটা কিডন্যাপার কে কখনো শুনিনি এমন করতে যা তুমি আমার সাথে করে যাচ্ছো।এসব ভালো আচরণের অর্থ কি? বলো, কি এর উদ্দেশ্য?

– যদি বলতেই হয় তবে বলবো পৃথিবীতে কিছু কিছু আত্মিক টানের জন্য কোন নামধারী সম্পর্ক নেই।কিছু কিছু সম্পর্কের সত্যিই কোন নাম থাকতে নেই।

– তবে কি আমি ধরে নেবো তুমি তোমার বস্ এর হুকুমে সব করছো না; স্ব-আত্মিক টানে ভুগছো?

– আমি জানি না বিন্দু।তবে এটুকু বুঝি শুরু থেকেই যথেষ্ট কঠিন আর নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকার যথেষ্ট চেষ্টা আমার ছিলো।আমিও একটা মানুষ। আমার মধ্যে অনুভূতি,মায়া,ভালোবাসার জোয়ার – ভাটা লুকোচুরি খেলে যায়। কী করে যেন রোজ আপনাকে খাইয়ে দিতে দিতে ওই মুখের জন্য আমার মধ্যে একটা অচেনা মায়া সৃষ্টি হয়ে গেলো।আমি খুব যত্ন করে সংযত রেখেছি নিজেকে।চেষ্টা করেছি ধমকের সুরে কথা বলে নিজের পরিচয়ে অটল থাকতে।আমি জানি আপনি কারও স্ত্রী।তবুও আমার অনুভূতি আপনার সামাজিক মর্যাদার সূত্র ধরে অংক কষতে গিয়ে হেরে গেছে বিন্দু।আমি পারিনি, আমি পারলাম না সত্যিকারের কিডন্যাপার হয়ে উঠতে।
.
ত্রিভূজের চোখ গড়িয়ে আবার জল পড়ছে।সে জলের আয়নায় আমি আমার জন্য ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছি।সে জলের স্বচ্ছতায় আমি আমার নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছি।আমি দেখতে পাচ্ছি, একটা অসহায় নিষ্পাপ মুখ কোন এক অজানা যাতাকলে পিষ্ট হয়ে আত্মাহুতি দিতে এসেছিলো এই অন্ধকার মৃতালয়ে।যেখানে ভালোবাসা থাকতে নেই।যেখানে মায়ার অস্তিত্ব ছেঁটে কেটে বাদ দিতে হয় অস্তিত্বধারী জীবন্ত শরীর থেকে।
.
আমি জানি না এই মুহূর্তে ত্রিভূজের কথায় কি উত্তর করা উচিৎ।এমন কিছু সময় আসে যখন মানুষ ভাষাহীন হয়ে পড়ে।রাকিবও কোনদিন এমন করে মায়ায় বাঁধেনি আমায়।কখনো ভুল করেও আমার জন্য এক ফোঁটা লোনা জল দেখিনি রাকিবের চোখের কোণে।নিঃস্বার্থ
ভালোবাসায় উদ্ভাসিত ত্রিভূজ আমায় চিনিয়ে দিলো ভালোবাসার অনুভূতির রঙ কেমন হয়।কাউকে ভালোবেসে চরম অসহায়ত্বে জমানো অনুভূতির বিচ্ছুরন বুঝি এমনই হয়।এখনও জানি না, আমার করণীয় কি।ভালোবাসাকে সায় দিয়ে ভালোবাসতে না পারি ওর ভালোবাসাকে, ওর অনুভূতিকে অবজ্ঞা করার সাহস আমার নেই।কারও ভালোবাসাকে বুকে তুলে নিতে না পারি ঘৃনা ভরে ফিরিয়ে না দিয়ে শ্রদ্ধাটুকু তো করতেই পারি।
.
– তোমার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে আমি সম্মান জানাই ত্রিভূজ।তুমি যা দিয়েছো তার প্রতিদান দেবার মতো কিছুই যে নেই আমার কাছে।

-কিছু পেতে তো কিছু দেইনি বিন্দু।গত কয়দিনে এটুকুই বুঝেছি, আমি এখনও মরে যাইনি।এখনও মনুষ্যত্ব, প্রেম, আবেগ, অনুভূতি আমায় দোলায়িত করে।কখনও কাউকে ভালোবাসিনি আমি বিন্দু।জীবনের কঠিন যুদ্ধ কি তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।বেঁচে থাকা যে কতো কঠিন তা আমি তিল তিল করে উপলদ্ধি করেছি।ভালোবাসার শীতল স্পর্শ, খোলা আকাশের নিচে কারও আঙ্গুল জড়িয়ে বসে থাকা, বেখেয়ালী বাতাসে এলোমেলো করে দেয়া কারও চুলে হাত বোলানো অথবা মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলতে পারা – ঘুমিয়ে গিয়ে দূরত্ব বাড়াতে চাইনি, এসব কিছু এসব অনুভূতি আমার জন্য নয়।বিধাতা এক পৃথিবীতে সবাইকে সব কিছু দেন না।হাহাকারগুলো না দিলে বুক ভেজা কান্নারা যে বঞ্চিত হবে।কান্নারা না থাকলে সুখগুলো যে অন্ধকারেই থেকে যাবে।আমার মতো মানুষগুলো বেঁচে থাকে চরম একাকিত্ব নিয়ে আপনাদের সুখে ভরা জীবনগুলোকে অন্ধকারের পার্থক্য বুঝিয়ে দিতে।

– ত্রিভূজ… প্লিজ আর কেঁদো না।আমি খুব স্যরি।তোমায় চিনে নিতে আমি বড্ড ভুল করে ফেলেছি।

– স্যরি হবার কিছু নেই বিন্দু।আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।আমার এখন একটাই কাজ।বস্ এর হাত থেকে আপনাকে পালাতে সাহায্য করা।

– তুমি কি বলছো বুঝতে পারছো?

– আমি জানি।যা বলছি সব বুঝেই বলছি।

– কিন্তু ত্রিভূজ তুমি আমায় ছেড়ে দিলে ওরা তো তোমাকে বাঁচতে দেবে না।

– সেটাও জানি আমি।

– অসম্ভব।

– কিছু অসম্ভব নয়। আমি যা বলবো এটুকু যে আপনাকে করতেই হবে বিন্দু।আমি তো আমার ভালোবাসাকে বাঁচাতে চেয়েছি।আর তো কিছুই চাইনি আপনার কাছে।আমি তো আমার ভালোবাসার স্বীকৃতি চাইনি বিন্দু।

– তাই বলে নিজের জীবন বিপন্ন করে?

– হা হা হা……. হাসালেন বিন্দু।আমার জীবন তো বহু আগেই বিট্রে করে ছেড়ে গেছে আমায়।আজ যখন নিজেকে আবার জীবিত মানুষ বলে মনে হলো তখন এই চাওয়াটুকু না হয় পূর্ন করে দিলেন।আমি তো বলিনি আমায় ভালোবাসতে।

– চুপ করো ত্রিভূজ।

– দেবেন না? বলুন না, আমার ভালোবাসাকে বাঁচতে দেবেন না? বাঁচিয়ে রাখবেন না?

– যাকে ভালোবাসো তাকে পেতে না চেয়ে উড়িয়ে দিচ্ছো আকাশে?

– আকাশ সীমানার যেখানেই উড়ে বেড়ান না কেনো, প্রতিটি কোণের দখলই তো আমার।ভালোবাসলে তাকে কাছে পেতে চাওয়া নয় ; বাঁচিয়ে রাখাটাই মূল দায়িত্ব হয় আর তা যে কোন মূল্যে।

– ত্রিভূজ একটা সিদ্ধান্ত নিলাম।

-কি সিদ্ধান্ত বিন্দু?

– আমি ফিরে যাবো না।ভালোবাসার লোভ আমাকেও চূড়ান্ত মাত্রায় যন্ত্রনা দেয়। তোমার মতো করে কেউ কখনও ভালোবাসেনি আমায়।না খেয়ে সারাটা রাত তুমি সেবা করে আমায় সারিয়ে তুলেছো। খেয়াল রেখেছো কখন কি লাগবে আমার।বস্ এর হুকুম এর বাইরেও অনেকটা করেছো আমার জন্য। নির্জন ঘরে একা পেয়েও আমায় তুমি নষ্ট করে দাওনি।আজ আমি যখন তোমায় আঘাত করতে গেলাম তুমি আমায় বাঁচাতে চাচ্ছো।এটাই ভালোবাসা ত্রিভূজ।
.
এই যে তোমার চোখে জল এটা ভালোবাসার সার্টিফিকেট।আমি জানি, পুরুষ খুব সহজে কাঁদে না।আমার জন্য কেউ কখনও কাঁদেনি ত্রিভূজ।আমি তোমাকে রেখে পালাতে পারবো না।তোমার যেমন ভালোবাসার জন্য করণীয় আছে, তেমনি তোমার ভালোবাসার প্রতি সম্মান রেখে আমারও কিছু দায় বদ্ধতা আছে।না, আমি কিছুতেই তোমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পালাতে পারবো না।

– একটা কিডন্যাপারের জন্য এতো মায়া থাকতে নেই বিন্দু।

– ভুল বললে।
তুমি তো কিডন্যাপার নও।তুমি জীবন যুদ্ধে ঠেকে গিয়ে স্বেচ্ছায় হারতে চাওয়া এক যোদ্ধা।না বুঝে ওদের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিলে তুমি।তোমার ভেতরের মানুষটা এখনও বেঁচে আছে ত্রিভূজ।

– বিন্দু, আজ আপনাকে ভালোবেসে একটা জিনিস দেবো। আপনি নেবেন?

– জানি, ভালোবাসার এ সম্পর্কের একটা নাম দেবে।তাই তো?

– নাম দেই কী করে? আগেই তো বলেছি সব সম্পর্কের নাম থাকতে নেই।

– তাহলে কি দেবে আমায় তুমি?

– নিন।এটা এখন থেকে আপনার।

-রিভলভার!!!!

– হু, রিভলভার। আজ হেরে যাবার অবেলায় কলম রেখে রিভলভারের শক্তিকেই মেনে নিন। এর অনেক ক্ষমতা বিন্দু।যা আপনি ভাবতেও পারবেন না।আগে নিজেকে বাঁচান।তবেই না আপনার কলম বাঁঁচবে।কলমকে বাঁচাতে আজ আপনাকে এটা হাতে তুলে নিতেই হবে।কলমকে হেরে যেতে দিতে নেই,আপনি একজন কলম যোদ্ধা। কাল রাতে আমি বস্ এর সাথে দেখা করিনি।আপনার খবরাখবরও জানাইনি।আজ সকালেও যাইনি।তার লোকজন এতোক্ষনে হয়তো এ পথে রওনা হয়ে গেছে।আপনি পালান বিন্দু।আর সময় নষ্ট করবেন না প্লিজ।রিভলভারটা ধরুন, এই যে ট্রিগার।নিশানা ধরে এখানে প্রেস করবেন সময়ের দাবিতে।

– আমি পালাবো না ত্রিভূজ।মরার আগে মরতে শিখিনি আমি।ভুলে যেও না, আমি লেখক।লেখকদের বুকে ভয় থাকতে নেই।লেখকরা বাঁচতে শেখায়।মরে যেতে পথ এগিয়ে দিতে নয়।

– তাহলে?

-আঁধারেই নিজের সখ্যতা গড়ে নিয়ে সবটুকু যন্ত্রনা ঢেলে দিতে শিখেছি অচেনা ঈশ্বরের পায়ে।আমায় নিয়ে ভেবো না ত্রিভূজ

– বললেই হলো? আঁধার নিয়েই বেঁচে থাকলে আলোর কি হবে বিন্দু?

-আলোকে তো অস্বীকৃতি দেইনি।শুধু ভালোবাসাটুকু আঁধারকে দিতে চেয়েছি।আলো যে আমায় কাছে টানেনি।

-বিন্দু, বন্দি জীবনের মুক্তি নিন,এক্ষুনি সময়।জলদি পালান।

– মুক্তি? হাহ! বন্দি কারাগারের এক ডানা ঝাপটানো পাখি বাস করে আমার মধ্যে। ঝাপটাতে ঝাপটাতে একদিন ডানার হারগুলোও ভেঙ্গে গেছে।আর সে আগের মতো ডানা ঝাপটায় না।তবে খোলা আকাশ দেখলেই তার চোখ ভিঁজে আসে।জানে এর মুক্তি নেই।তবুও মুক্ত আকাশে উড়বার তার দুরন্ত লোভ।

-তবে সে উড়ুক।আরও রঙ্গিন হয়ে উঠুক।

– রঙ? সে তো সেই কবেই মুছে গেছে।খাঁচার জং পড়া শিকগুলোই ওকে বিবর্ন করে দেয় রোজ।

– বিন্দু!!! সর্বনাশ!!! জলদি পালান!!!
.
চলবে……….

পর্ব: এক দুই তিন চার পাঁচ

[রিভলভার – ওয়াহিদা সুলতানা লাকি]

Comments

comments