রিভলভার || ওয়াহিদা সুলতানা লাকি

0

[পর্ব-২]
.
সকাল হয়ে গেছে।এতো উপরে এমন নিরব ঘরে বলতে গেলে বাইরের কোন কোলাহলই কানে অবধি পৌঁছে না।এই ঘরে বন্দি আছি আজ পাঁচ দিন হয়ে গেলো।
এরমধ্যে গোসল করা হয়নি কাপড়ের অভাবে।এখন বসন্তকাল।হালকা ঠান্ডা আছে বলেই অতোটা অসহ্য হয়ে না উঠলেও নিজের কাছে কিছুটা অস্বস্থিবোধ হচ্ছিলো।ত্রিভূজ ঘরে ঢুকলো।খাবারের থালাটা টেবিলে নামিয়েই যথারীতি আমার হাত জোড়া বেঁধে দিলো যেন পালিয়ে না যাই।

মনে মনে হাসলাম।পালাবার সুযোগ যদি পাই আমার পা দুটোই কি যথেষ্ট নয়? হাত বেঁধে কি লাভ ? বলতেই সে আমার পা ও বেঁধে দিতে চাইলো।বললাম, অমন নিরস ব্যক্তিত্বে সবই মানায় তবু মুখটায় যে মায়ার আভা ছড়িয়ে তাতে কিন্তু এমন কঠোরতা খাপ খায় না।
.
ত্রিভূজের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করলাম।অথচ তার মুখাবয়বে কোন পরিবর্তনের রেখা খুঁজে পেলাম না।হা করতে বলে খাবার তুলে দিলো মুখে।এই কয়দিনে ত্রিভূজকে আমার কাছে দস্যি মনে হলেও ডাকাত মনে হয়নি।দস্যি কি বলছি সে তো আবার পুরুষ।তার মানে ত্রিভূজ হলো দস্যু ছেলে।কিন্তু দস্যু মানে তো ডাকাতই।তাহলে ডাকাত না বলে দস্যু বলায় এমন অন্য রকম অনুভূতি হয় কেন? নিজেই ভাবছি আর হাসছি।এ ঘরটায় বন্দি থেকে থেকে ব্রেইন কলাপ্স হয়ে যাচ্ছে আমার।
.
– খাচ্ছেন তো খান।হাসছেন কেন?
– হাসি পেলে কি করবো? তোমার নামটা মনে পড়লেও কিন্তু ভীষন হাসি পায় আমার।”ত্রিভূজ” এটাও নাকি মানুষের নাম।
– হু।
– হু, কি?আচ্ছা, আমার নাম জানতে চাইলে না যে?
– জানি।
– আমার নাম তুমি আগেই জানো?
-হু।
– বলো তো আমার নাম কি?
– “বিন্দু”
– বাহ! অবাক হলাম।
– অবাক হবার কি আছে? আপনি কিডনাপ হয়েছেন।সব নাম – ধাম,ঠায়- ঠিকানা জেনেই আমরা আপনাকে কিডনাপ করেছি।
– সে তো বুঝতেই পারছি।তা কতো টাকা মুক্তি পন দাবি করেছো আমার জন্য?
– বস্ জানেন।
– কেনো? তুমি জানো না?
– আহ! এতো কথা বলছেন কেন? চুপচাপ খেয়ে নিতে পারছেন না? আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা বসের নির্দেশ।মরে গেলে মুক্তি পন পাবো না।
– ঠিক আছে, তোমরা যেন মুক্তি পন না পাও সে ব্যবস্থাই করবো।
– পুলিশে খবর দেবেন?
– নাহ।
– পালাবেন?
– সে সুযোগ কই?
– তাহলে চুপ করুন।খাওয়ানো শেষ।আমি আসি।

.
-ত্রিভূজ শোনো….
– জ্বি….
– অমন কাটা কাটা করে জবাব দাও কেনো? আরেকটু সুন্দর করে আরেকটু অমায়িক হয়ে কথা বলতে পারো না?
– ডাকলেন কেন?
– আমার প্রশ্নের জবাবও তো দিলে না।তাহলে একটা কাজ করে দিতে পারো?
– বলুন…
– আমি একজন লেখিকা।আমার না লেখার জন্য ভীষন মন কাঁদছে।লিখতে না পারলে বুকের মধ্যে কেমন একটা হাসফাঁস অনুভূতি হয়।এই ঘরের কোথাও একটু কাগজ কলম খুঁজে পেলাম না।তোমরা তো আমার হ্যান্ড পার্সটাও সিচ্ করেছো। আমার জন্য কিছু কাগজ, কলম এনে দিতে পারবে?
– জ্বি,পারবো।
– ওহ, ধন্যবাদ ত্রিভূজ।
– লাগবে না।
– মানে?
– আমি ম্যানারের ধার ধারি না।
– অদ্ভুত মানুষ!

.
সে আমার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে চলে গেলো।আমি চুপচাপ ভাবছি।আচ্ছা, ত্রিভূজ তো কিডনাপিং এর সময় ছিলো না ও এই দলে কাজ করে! ওকে দেখে তো গুন্ডাও মনে হয় না।কেমন গম্ভীর আর নামানো গলায় কথা বলে। প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি কোন শব্দই বের হয় না মুখ থেকে।তাহলে ওর মতো নিষ্পাপ চেহারার একটা ছেলে কেনো এ লাইনে? কিন্তু, আমিই বা ওকে তুমি সম্বোধন শুরু করলাম কখন থেকে? নাকি শুরু থেকেই তুমি করে বলতাম? কী জানি।আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না।এই যা! ত্রিভূজকে বাড়তি জামা কাপড় আনবার কথা বলতেই ভুলে গিয়েছি।
.
চারদিক নিরব। নিস্তব্ধতার কপাল ছুঁয়ে কিছুক্ষন পর পরই টোকা দিয়ে যাচ্ছে কোকিলের ডাক।বিল্ডিং এর পাঁচ তলার ফ্ল্যাটে আঁটকে রাখা হয়েছে আমাকে।সেদিন জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে দূরে একটা সাত তলা বিল্ডিং এর ফ্লোর গুনে গুনে অনুমান করে নিয়েছি।আশে- পাশে কাছাকাছি কোন বাড়ি নেই বললেই চলে।এখান থেকে পালাতে হবে।কিন্তু কী করে!
.
দরজার খুটখাট শব্দে বুঝে গেলাম সে এসেছে। দুপুরের ভাত আর একটা ব্যাগ নিয়ে ত্রিভূজ ঘরে ঢুকলো।আমি আজ ছয়দিন হলো বন্দি রয়েছি।এতোদিনে রাকিব কি একবারও আমার খোঁজ নেয়নি? পত্রিকা অফিসেও কি কারও মনে প্রশ্ন আসেনি আজ ছয়দিন আমি কোন রিপোর্ট জমা দেইনি? বাবা- মা কি জানে আমি যে কিডন্যাপড্? তবে কি সবাই চায় আমি হারিয়ে যাই? একটা মানুষ দিনের পর দিন বাড়ি ফেরেনি।কেউ কি খুঁজছে না আমায়? বুকের ভেতরটা চাপা নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে আসছে।ত্রিভূজ থালায় ভাত মাখছে।বড় হবার পর কেউ কোনদিন এমন যত্ন করে আমায় মুখে তুলে খাইয়ে দেয়নি; রাকিবও না। কেউ কখনো এমিন করে নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করেনি আমার কিছু লাগবে কি না। রাকিবের কাছে আমি ছিলাম গলগ্রহ পদার্থ। ব্যাগে কি, প্রশ্ন করতেই ত্রিভূজ বললো,

– বস্ কে বলে আমি আপনার জন্য কিছু জামাকাপড় কিনে এনেছি।শাওয়ার নিয়ে নিন।এখানে প্রয়োজনীয় শ্যাম্পু,সাবান, টাওয়েল সবই আছে।আজ পাঁচদিন আপনি শাওয়ার নেন না।শরীর খারাপ করবে।
.
আমি অবাক হয়ে ত্রিভূজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।পৃথিবীতে তাহলে এখনও মানুষ আছে!
.
– ত্রিভূজ শোনো…
-জ্বি
– কী করে বুঝলে এগুলোর যে খুব প্রয়োজন ছিলো আমার? আর জামার মাপই বা বুঝলে কী করে।
-কাছে আসুন।
– কি?
– হাত দিন।
– মানে?
– হাত দুটো তো বাঁধতে হবে রোজকার মতো।ওসব পরে দেখবেন।খাওয়া শেষে শাওয়ার নিয়ে ঘুমুবেন।
– আমার এতো যত্ন করছো, এতো খেয়াল কেনো রাখছো?বসের হুকুম?
– না।
-তাহলে?
-জানি না।কথা কম বলুন।
– ঠিক আছে।কাগজ,কলম দিয়ে গিয়েছিলে।ওগুলোতে কি লিখেছি দেখবে না?
– না।
-এতো আগ্রহ নিয়ে লিখলাম।তবে আমি কাকে দেখাবো?
– নিজের কাছে রেখে দিন।
-আমি কিন্তু সত্যিই লিখি,রিপোর্ট করি পত্রিকাতে।মাঝে মাঝে কবিতাও লিখি। একটা মজার ঘটনা শুনবে?
– না।
– খেতে খেতেই না হয় বলছি।
– আপনাকে খাইয়ে সুস্থ রাখা বসের অর্ডার।
– আচ্ছা, মুক্তিপনের টাকাটা কি পেলে?
– পেলে তো ছেড়েই দেয়া হতো।
– ঠিক আছে, রাতে যখন খাবার নিয়ে আসবে আমার মজার গল্পটা কিন্তু তখন বলবো।শুনবে তো?
– দেখা যাক। মুখ মুছে নিন।
– আচ্ছা, খাবার তো আমি হাতটা খোলা রাখলে নিজ হাতেই খেতে পারতাম।তুমি শুধু শুধু কেন কষ্ট করো রোজ?
– আপনি না খেয়ে মরে যেতে না পারলেও অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন।আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার হুকুম দিয়েছেন বস্।
– আচ্ছা, ধরো যদি মুক্তিপনের টাকাটা না পাও তোমরা কি আমায় মেরে ফেলবে?
– জানি না।
– তোমার বস্ জানেন,তাই না?
– চুপ।
.
ত্রিভূজের মুখটা কেমন লালচে আভায় ছেয়ে গেলো।জানি না কেনো এই রঙ্গের পরিবর্তন।আমি লেখা কাগজটা মাথার কাছে রেখে শুয়ে পড়লাম।আজ আমার ভীষন ঘুম পাচ্ছে।ত্রিভূজ যাবার জন্য ব্যাগ হাতে দরজা অবধি গিয়ে আবার ফিরে এলো।
.
– উঠুন।শাওয়ার নিয়ে তারপর ঘুমুবেন।
– ভীষন ঘুম পাচ্ছে আমার।
-আশা করি কথার অবাধ্য হবেন না।উঠুন।
.
সে চলে গেলো।সত্যি সত্যিই কেন যেন আমি ত্রিভূজের কথার অবাধ্য হতে পারলাম না।আকাশী রঙ্গের জামাটা হাতে নিয়েই মনটা শান্ত আকাশের মতো বিস্তীর্ন মনে হতে লাগলো।শাওয়ার নিয়ে জামাটা পরলাম।কতোটা দিন পর ভীষন ঝরঝরে লাগছে।ফ্যানের নিচে চুল শুকিয়ে শুয়ে পরলাম।এর মধ্যে কখন যে সন্ধ্যা পেড়িয়ে রাতের আঁধার নেমে এসেছে টেরই পাইনি।অনেকগুলো দিন পর এমন বেঘোরে ঘুমুচ্ছি আমি।সারা রাত ঘুমুতে পারি না টেনশনে।রাকিব কি করছে, না জানি কতো খুঁজছে আমায়।
.
ফ্যানের বাতাসে আমার চুলগুলো কাশফুলের মতো দোল খেয়ে যাচ্ছে বিছানা গড়িয়ে।যখন আয়নায় নিজেকে দেখেছিলাম, আকাশী জামার স্নিগ্ধতায় শান্ত আকাশ মনে হচ্ছিলো আমাকে।চুলগুলো ছিলো একটা মেঘের খন্ড।এখনও আমি ঘুমুচ্ছি।ত্রিভূজের আসার শব্দ আজ টের পাইনি। আমাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে ও খানিক্ষন চুপ করে বসে রইলো চেয়ারে।কী মনে করে আমার মাথার কাছ থেকে লেখা কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলো।
.
চলবে…….

(প্রথম পর্ব- রিভলভার||ওয়াহিদা সুলতানা লাকি )

Comments

comments