শেষ বিকেলের নয়নতারা|| সাহিত্য সম্ভার

0

ছোটগল্পঃ “শেষ বিকেলের নয়নতারা”

গল্পলেখকঃ তানিয়া আক্তার



 

নয়নতারা… তোমার কি সে কবিতা খানি মনে পড়ে? যে কবিতাখানি তুমি আমায় ভেবে লিখেছিলে? এক ভরদুপুরে ক্লাস শেষে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে যে কবিতা খানা তুমি আমায় আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলে…

প্রশ্নখানা শুনতেই নয়নতারা অপ্রস্তুত হয়ে একটু নড়েচড়ে বসল। বোঝা গেল বাস্তবতার ভেড়াঁজালে ভিড়ে গিয়ে নয়নতারার আজ মনে করার মত কিছুই অবশিষ্ট নেই। আর দু যুগ আগের যে কথা তা মনে না পড়াটাই হয়তো শ্রেয়।

কি লাভ মনে করে? শুধু শুধু কষ্ট পাওয়া..
তবে এত বছর আগের এই সামান্য কথাটা নয়নের মনে না পড়াতে টগরের বুকের ভেতরটায় এমন ব্যাথা অনুভূত হলো কেন!!!
নয়নতারার সত্যিই কি কিছু মনে নেই? সেই একসাথে লাইব্রেরীতে বসে পড়া, টঙ এর দোকানে চা খেতে খেতে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়া, চন্দ্রিমা তে পাশাপাশি বসে একে অপরকে রবী ঠাকুরের ছোট গল্প পড়ে শোনানো… কিছুই কি মনে নেই? নাকি সে কিছু মনে করতে চায় না।

পাশাপাশি একটি লম্বা বেঞ্চি তে আজ প্রায় দু যুগ পর পাশাপাশি বসে আছে টগর আর নয়নতারা। যে কপোত-কপোতীর প্রেম পুরো ক্যাম্পাসে এককালে অনুপ্রেরনা যোগাত, সে কপোত-কপোতী আজ দু প্রান্তের বাসিন্দা। একসাথে তাদের পথ চলা হয়ে উঠে নি ঠিকই, তবে একসাথে তারা বৃদ্ধ হয়েছে। দুজনের চোঁখেই আজ ভারী চঁশমার গ্লাস। বয়সের ভারে দুজনের মুখেই আজ বলিরেখাঁর ছাপ। দুজনের সেই ঘন কালো চুলের রং পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে সাদা।

নয়ন…. (এবারও নয়নতারা কেমন যেন চমকে উঠল)
এই দেখ দেখি কান্ড.. তোমাকে নয়ন বলে ডাকছি!! তুমি বিব্রতবোধ করছ না তো?
না.. ও তো তোমারই দেওয়া নাম ছিল। অনেককাল পর শুনলেম তো তাই ভেতর টা কেমন করে উঠল।
শুনে যেন টগরের ভেতরে প্রানের সঞ্চার হল। তার মানে কি নয়ন সব ভোলে নি?

একটু ভেবে নয়ন বলল, শুনেছি তোমার দু ছেলে।ছেলেরা কেমন আছে?
ভাল আছে। দুজনই বাহিরে থাকে বউ বাচ্চা নিয়ে।

তোমার স্বামী সন্তান?
স্বামী ভাল আছে। খুব যত্ন করে আমায় জানো!? রোজ কবিতা পড়ে শোনায়, চশমা খুজে চোঁখে গুজে দেয়। গল্প করতে করতে কখন যে আমাদের সময় কেটে যায় টেরই পাই না। বলতে বলতেই নয়নের মুখে হাঁসির ছাপ দেখা গেল। বোঝা গেল সংসার জীবনে সে ভালো আছে..

আর সন্তান?
হঠাৎ করেই হাঁসি মুছে গিয়ে নয়নের মুখে অন্ধকার নেমে এল। মোটা গ্লাসের কাঁচ পরিষ্কার করতে করতে সে বলল, সন্তানের মুখ দেখবার সে সৌভাগ্য আর হয়ে উঠে নি।
বিয়ের ছ’মাসের মাথায় একটি এ্যাকসিডেন্ট হল তারপর ডাক্তার রা বলে দিল, মা হবার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। তারপরও অজিত বাহিরের নানান ডাক্তার দেখিয়ে চেষ্টা করেছিল, কিন্তুু সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হল। নয়ন একটু চুপ থেকে বলল, মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানো, মনে হয় অজিত কে বিয়ে করে আমি শুধু কষ্টই দিতে পেরেছি। যে পরিমান ভালবাসা সে আমায় দিয়েছে তার কিছুই আমি তাকে দিতে পারি নি। না দিতে পেরেছি ভালবাসা, না সন্তান!! অথচ সব ই সে মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছে।

নয়নের কথা শুনতে শুনতে কেমন যেন টগরের ভেতরে অনুশোচনার উদ্রেক হল। সেদিন হয়তো সে ইচ্ছে করলেই নয়ন কে পেতে পারত। কিন্তুু সমাজ পরিবার তাকে সে সমর্থন করে নি। কারন নয়ন যে হিন্দু। একটি মুসলমান ছেলে আর একটি হিন্দু মেয়ের প্রেম সমাজ মেনে নিতে পারে না। বাধ্য হয়েই তারা একে অপরের থেকে দু পহ্মের সম্মতিতেই আলাদা হয়ে গিয়েছিল। এত ভালবাসাও সেদিন তাদের এক করে রাখতে পারে নি। তার ফল আজ চার-চারটি জীবনকে দিতে হচ্ছে।

নূপুর কেমন আছে? (নয়নতারার এ প্রশ্নে যেন এবার টগরও একটু চমকে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এল)
ভাল আছে। তোমার কথা খুব বলে জানো!!?
ও..মা.. তাই নাকি? কি বলে আমার কথা?
বলে যে, তুমি খুব সুন্দর করে কবিতা আবৃত্তি করতে। ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে যখন পুর্নেন্দু পত্রীর “সেই গল্পটা” আবৃত্তি করতে তখন পুরো অডিটোরিয়াম যেন স্তব্ধ হয়ে যেত। শরীরের লোম দাড়িয়ে যেত।
নয়ন হেসে বলল, ওসব কবিতা আবৃত্তি এখন আর আমায় দিয়ে হয়ে ওঠে না। অনেককাল হল ছেড়ে দিয়েছি। আর কি বলে নূপুর?মেয়েটা কি এখনও তেমন পাগলী আছে?
আমায় বড় বোনের মত ভালবাসত।
আর বলে, এত সুন্দর করে হাসতে যে ও মাঝে মাঝে ভেবে পায় না, আমি কেন তোমায় বিয়ে না করে ওকে বিয়ে করলাম!!
বলেই টগর থতমত খেয়ে গেল।
নয়নও মুহুর্তেই কেমন গম্ভীর হয়ে গেল।

কিছুহ্মন চুপ করে থেকে নয়ন বলল, আচ্ছা টগর তুমি কখনো ভেবেছিলে আমাদের আবার কখনো দেখা হবে?
হ্যা ভেবেছিলাম।
কী করে?

টগর সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল, আবৃত্তি করা ছেড়ে দিলে কেন? ওটাই তো ছিল তোমার প্রান।
প্রান দিয়ে কি হবে? শরীর টাই যে আর কোথাও খুঁজে পাই নি। শরীরহীণ প্রান দিয়ে আর কবিতা আবৃত্তি হয় বলো? বলেই নয়ন একটু হাসল।

বেশ বলেছো।
টঙ এর দোকানে দাড়িয়ে অনেককাল চাঁ খাওয়া হয় না, তোমার কি আজ সময় হবে একসাথে দাড়িয়ে টঙ এর দোকানে গিয়ে চা খাওয়ার?
নয়ন হেসে বলল, সে বয়স কি আর আছে? লোকে কত কিছু বলবে!!
তাই বলে কী, লোকের ভয়ে আমরা টঙ এর দোকানে গিয়ে চা খেতে পারব না?
নয়ন এবার টগরের চোঁখে চোঁখ রেখে বলল, তুমি হয়ত ভুলে গিয়েছ টগর, সেদিন লোক, সমাজের ভয়েই তুমি আমায় স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করতে পার নি?

টগর কি বলবে ভেবে পেল না, কিছুহ্মন মুখ নিচের দিকে রেখে আস্তে আস্তে বলল, নয়ন… তুমি কি বিয়ের পরও আমার কাছে ফিরতে চেয়েছিলে?

নয়ন সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল, যে কবিতাটা তোমায় ভেবে লিখেছিলাম, সে কবিতাটা শুনবে?

টগর অবাক হয়ে বলল, তোমার মনে আছে?
নয়ন একটু হেসে কবিতা আবৃত্তি করা শুরু করল-

“নয়নের পানে চাহিয়া থাকিয়া তোমারেই যখন দেখিতে না পাই,
তুমি কি জানো পৃথিবীর অস্তিত্বই আমি ভুলিয়া বসিতে যাই।
আমারে কি তখনও প্রিয় মনে রাখিবে?
যখন তোমার হৃদয়ে অন্য কোন কলতান বাজিবে!
ভুলিবার ছলেও ভুলিও নাকো,
এই নয়নতারারে মনে রেখো”

বাহ! অসাধারন.. আজও তুমি তেমনি করেই কবিতা আবৃত্তি কর, যেমনটি করতে ভার্সিটি জীবনে।

নয়ন একটু হাসল। তারপর বলল চল, ওঠা যাক। বড্ড দেরী হয়ে গেল। বলেই নয়ন চশমাটা ঠিক করে, শাড়ির আচঁলটা সামনে টেনে নিয়ে উঠে দাড়াল।
টগর ও উঠে দাড়িয়ে বলল, তুমি কিন্তুু আমার একটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই চলে যাচ্ছ।
কোনটা বলোতো?
তুমি কি বিয়ের পরও আমার কাছে ফিরতে চেয়েছিলে?
নয়ন এবার একটু হাসল, হেসে বলল, ফিরতে চেয়েছিলাম কিনা জানি না, তবে আজীবন টঙ এর দোকানের সামনে দাড়িয়ে একসাথে চা খাওয়ার জন্য হলেও পাশে টগর নামের একজন কে চেয়েছিলাম। বলেই চোঁখ থেকে চশমাটা খুলে কিছুহ্মন নয়ন টগরের দিকে চেয়ে রইল, তারপর বিদায় না জানিয়েই পার্কের পথ ধরে হাঁটা ধরল।

টগরের মুখ থেকে কোন কথাই বের হল না, নির্বাক দৃষ্টিতে সে পথের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া। আস্তে আস্তে নয়নতারার চলে যাবার পথ ঝাপসা হওয়া শুরু করল…………..

টগর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে পাঞ্জাবির আস্তিনে দু’ চোঁখ মুছে নিল। সেদিন দু কদম পিছিয়ে না নিলে হয়ত বয়সের ভারে চলে যাওয়া বৃদ্ধাটি আজ তার জীবন-বিকেলের নয়নতারা হত…….

Comments

comments