জীবনানন্দ, নিয়তির ক্রীতদাস: আসাদুল ইসলাম

0

জীবনানন্দ দাশের ১২০তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি –  

আসাদুল ইসলাম:

একটা নিরহংকারী গদ্যভাবের চেহারা নিয়ে আপনি জন্মাইলেন। অথচ বাংলাদেশের জল মাটি হাওয়ায় জন্ম নেয়া আপনিই প্রধান কবি, আপনি আমাদের অহংকার, আমাদের গ্লামার। কিন্তু আপনার চেহারায় কোনো গ্লামার নেই, আপনার কলমের ছাপ আপনার চেহারায় একটুও প্রতিফলিত হইল না।

আপনি একটা ভুল মুখ নিয়ে জন্মাইছিলেন। আপনার মুখ দেখে আমার বার বার বিভ্রম হয় আপনার কলম থেকেই এসেছে এমন অনন্তকালের অনাসক্ত পংক্তি, অনন্ত জীবন যদি পাই আমি তাহ’লে অনন্তকাল একা। আপনার চাষার হাতে এরকম সোনার অক্ষর কী করে ফলল। অনন্ত জীবন যদি পাই আমি তাহ’লে অনন্তকাল একা, একাই থেকে গেলেন আজীবন, শরীরে মাটির গন্ধ মেখে চাষার মতো কিম্বা জলের গন্ধ মেখে মেছোদের মতো একা রয়ে গেলেন, একা একা হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথ হাঁইটা গেলেন। পৃথিবীর আনাচে কানাচে জীবিকার জন্য কত কিছু করতে হলো আপনাকে, শিক্ষকতা, ব্যবসা, ইন্সুরেন্সের এজেন্টগিরি, কিন্তু সবখানেই নিয়তি এসে বাধা হয়ে দাঁড়াইল, আপনি ব্যর্থ হইলেন, অসহায় হয়ে জলের মতো ঘুরতে লাগলেন, কিন্তু একান্ত গোপনে নির্জনে কলম হাতে লিখে চললেন, সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়! নদীর রূপে, নারীর রূপে মুগ্ধ হইলেন। সেই রূপকে অপরূপ ভঙ্গিমায় ছেঁকে তুললেন কবিতায়।

আপনার মতো করে কেউ সকাল দুপুর গোধূলি দেখেনি, আসলে আপনার মতন কেউ নেই আর। বাংলার অকৃত্রিম মুখ আপনিই শুধু অবিকল দেখেছেন। কিন্তু আপনার মুখপানে তার কোনো ছায়া পরিস্ফূট হলো না। কী আশ্চর্য! এমন নৈর্ব্যক্তিক পানসে মুখ আপনি কী করে ধারণ করছিলেন। আপনি বরিশাল টু কলকাতা টু দিল্লি হন্নে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন চাকরি, কিন্তু চাকরি আপনারা কপালে নেই। স্থবিরতা, কবে তুমি আসিবে বল তো, স্থবিরতা আসেনি আপনার জীবনে। নিয়তির ক্রীতদাস হয়ে একটা জীবন পার করে দিয়া গেলেন। হায়, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি, অভাবে দারিদ্র‍্য আপনাকে নত হয়ে থাকতে হইল, একটা উন্নত জীবন আপনার কপালে জুটল না। নিয়তির চেয়ে ভয়ংকর দুশমন আপনার জীবনে আর আসেনি। একটা বেদনার জীবন নিয়ে আজীবন বিমর্ষ রয়ে গেলেন, আর অক্ষরে অক্ষরে চাষ করে গেলেন বিমর্ষতার বিবমিষা।

বাংলার অপরূপ মুখ আপনি এমন মগ্নতায় নরম নীলাভ ব্যথিত শব্দ দিয়ে জাগিয়ে তুললেন, তাতে বিস্ময়ের ঘোর কাটে না, আর নিজের মুখটাকে করে রাখলেন ধূসর পেঁচার মতো নিরাবেগ। তবু এমন ফাল্গুন রাতে আপনার মুখটাই বেশি বেশি মনে পড়ছে। হে জীবনানন্দ, হে নিয়তির ক্রীতদাস, আপনার মুখের রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না, আপনাকে ভালোবাসি কবি।আপনাকে জন্মদিনের ভালোবাসা।

আসাদুল ইসলাম
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

Comments

comments