{{theTime}} |   Wed 17 Jan 2018

কেন এই অবমূল্যায়ন ক্ষুদে নারী ফুটবলারদের?

প্রকাশঃ বুধবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৭    ১৯:৪৭
তানভীর হাসান তানু

“আমরা ধানমন্ডি মহিলা কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে অনেক কষ্ট করে দিনাজপুরের ট্রেনে উঠলাম। সেখানে ভোর বেলায় আসার পর আবার ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের ট্রেন ধরলাম। তারপরে রবিবার সকালে (১২ নভেম্বর) পীরগঞ্জের রেল ষ্টেশনে পৌঁছালাম। কিছুক্ষন পর সেখানকার একটি হোটেলর নাস্তা করি। তারপরে বাসষ্ট্যান্ডে একটি লোকাল বাসে উঠলাম, জায়গা হচ্ছিলো না তবুও আসলাম কষ্ট করে সেই বাসেই। আমি মনে করে ছিলাম আমরা অনেক ভাল কিছু করেছি, তাই অনেকজন আমাদের রিসিভ করতে আসবে ষ্টেশনে। কিন্তু দুঃখের বিষয় কেউ আমাদের রিসিভ করতে আসলো না। আমার মনে হয়, আমরা ভাল কিছু করতে পারিনি। তাই তো কেউ রিসিভ করতে আসেনি আমাদের।”

অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় নারী ফুটবলের ফাইনালে উঠে রানার্সআপ হওয়া ঠাকুরগাঁও রাণীশংকৈল উপজেলার রাঙ্গাটুঙ্গি অজোঁপাড়াগাঁয়ের আদিবাসী কিশোরী খেলোয়ার বিথিকা কিসকু এভাবে তার মনের কষ্টের ও আবেগের কথা প্রকাশ করছিল সেইদিন।

বিথিকা কিসকুর সেই কথা গুলো শুনে তাৎক্ষনিক থমকে গিয়েছিলাম। তার কথায় মনে হয়েছিল নবজাগরণের সূত্রপাত করা ক্ষুদে নারী ফুটবলারদের কদর মোটেও বুঝতে পারেনি ঠাকুরগাঁওবাসী ও আমি নিজেও। আমি সংবাদকর্মী হিসেবে গিয়েছিলাম। প্রথমবারের মতো চূড়ান্ত পর্বে অংশগ্রহণ করে রানার্সআপ ট্রফি অর্জন করেছে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েরা। দেশব্যাপি যে ঠাকুরগাঁওয়ের নাম ছড়িয়ে দিয়েছে তারা। তাদেরকে স্থানীয় এমপি, উপজেলা প্রশাসন, ক্রীড়া সংস্থা, সুশীল সমাজ ও জনপ্রতিনিধিরা নবজাগরণের সূত্রপাত করা ক্ষুদে নারী ফুটবলারদের মনে হয় অন্য রকম ভাবে বরণ করে নেবে সেই ভেবে। আর দেশবাসীর কাছে আমিও একটি সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরবো ঠাকুরগাঁওবাসীর উৎসাহের বিষয়টি নিয়ে।

সময় ৭.১০ মিনিট পীরগঞ্জ রেল ষ্টেশনে গিয়ে দেখি একটি শার্টল ট্রেন এসে থামল। ট্রেন থেকে অন্য যাত্রীর মতো ক্লান্ত শরীরে একঝাঁক কিশোরী নামতে শুরু করল। তাদের বরণ করার জন্য স্থানীয় এমপি, প্রশাসনের কর্তকর্তা ও এলাকার কোন মানুষকেও লক্ষ্য করা গেল না। কাউকে ষ্টেশনে না দেখে ক্ষুদে নারী ফুটবলারদের মুখ গুলো কেন জানি অম্লান হয়ে গেল।

অবশেষে তাদের সাথে পায়ে হেঁটে বাস স্টেশনে যাওয়া শুরু করলাম গিয়েই ওদের সঙ্গে আমিও একটি লোকাল বাসে করে রাণীশংকৈল উপজেলায় পৌঁছাই। পরে ৫৫০ কি.মি. পথ পাড়ি দেওয়া ওই ক্ষুদে নারী ফুটবলারদের ভ্যানযোগে ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে রওনা দেয়। আমিও একটি ভ্যানে করে তাদের সাথে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। যেতে যেতে এক এক জন নিজ বাড়িতে যাওয়ার জন্য ভ্যান থেকে নেমে আবারো পাঁয়ে হেটে বাড়ির পথে রওনা দেয়। তখন আমিও এক খেলোয়ারের পেছন পেছন তার বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করি।

বাড়ির সামনে গিয়েই দৌড় দেয় ওই কিশোরী। দৌড়ে গিয়ে প্রিয়তমা মা’কে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে। আসলে সেই কান্না কষ্টের ছিল না, ছিল ১৩দিন মাকে না দেখার কষ্ট। তাই বুকে জড়িয়ে ধরে একটু কষ্ট দূর করতেই এই আনন্দের কান্না।

পরে কথা বলে জানতে পারি ওই ক্ষুদে ফুটবলারের নাম মনিরা। কিছুক্ষন তার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার পর বেড়িয়ে পড়লাম। আসার পথে তখন নিজে নিজেই প্রশ্ন করলাম এই দারিদ্র পরিবারের প্রমীলা ফুটবলারদের খবর দেশব্যাপি নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটিয়েছে তাদেরকে কেন এই অবমূল্যায়ন? প্রমীলা বা ক্ষুদে ফুটবলারদের অবমূল্যায়নের জন্য দায়ী কারা স্থানীয় প্রশাসন না ঠাকুরগাঁওবাসী? তবে আমি ব্যক্তিগত নিজেকেই দায়ী মনে করছি।

এছাড়া স্থানীয় দুই এমপি ইয়াসিন আলী ও সেলিনা জাহান লিটা শুধু সভা সেমিনারে নারী জাগরণের অনেক কথায় বলেছেন ইতোমধ্যে। নিজ এলাকায় যারা সুনাম বয়ে আনা নারী ক্ষুদে ফুটবলারদের মূল্যায়ন করলেন সেটি সচিত্রে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার ওই দিন। এমপি সাহেবরা “ ঐতিহ্য সম্ভাবনা মত, জনপদ ঠাকুরগাঁও ” কথাটি সত্যি। কিন্তু আপনারা কেউ ঠাকুরগাঁওয়ের পরিবর্তন করতে পারেননি। শুধু নিজেদের গুনগান ও দলাদলি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জনগণের কারণেই আজ আপনারা মূল্যায়ন পাচ্ছেন দামি গাড়ি-বাড়ি, কাপড়-চোপড়, অর্থের পেছনে ছুটছেন যা অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু আমাদের ক্ষুদে ফুটবলারদেরকে কেন অবমূল্যায়ন করলেন প্রশ্ন রইলো?

ঠাকুরগাঁও যে সকল সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের দোষ আমি দিব না। আমরা নিজেই তো ঠাকুরগাঁওয়ের কোন ভাল কাজের সুনাম ও মূল্যায়ন করতে শিখিনি। কেউ ঠাকুরগাঁওয়ের জন্য সুনাম বয়ে নিয়ে আসুক মুখেই বলি শুধু। বাস্তবের উদাহরণ তো এই রাঙ্গাটুঙ্গি অজোঁপাড়াগাঁয়ের কিশোরী খেলোয়াররা.....।

আমি, আপনি বা আপনারা কি পারতাম না স্টেশনে গিয়ে তাদেরকে স্বাগত জানাতে। তাদের বরণ করে, হেরে যাওয়ার কষ্টটা একটু হালকা করে দিতে। কিন্তু .............?

এর আগে লক্ষ্য করেছি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এমপি রমেশ চন্দ্র সেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মনোনীত হওয়ায় ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ স্বাগত জানিয়েছে, বরণ করে নিয়েছিলেন রাজধানী থেকে ফেরার ওইদিনেই। কয়েক হাজার মোটরসাইকেল নিয়ে নেতাকর্মীরা রিসিভ করতে গিয়েছেন সে সময়। অভিনন্দন ও শুভেচ্ছায় শহরে ব্যানার ফেস্টুনে ভরপুর ছিল রাজনৈতিক দুই দলের নেতাকর্মীদের দখলে। ওই দুই কৃতি নেতা বাংলাদেশের দুটি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন হয়েছিলেন বলেই ঠাকুরগাঁওবাসী তাদের মূল্যায়নের কমতি রাখেনি। কারন দেশবাসী ওই দুই ব্যক্তির মাধ্যমেই ঠাকুরগাঁও জেলাকে চিনবে বলেই। তবে রাণীশংকৈল উপজেলার রাঙ্গাটুঙ্গি অজোঁপাড়াগাঁয়ের কিশোরীদের সারাদেশে নবজাগরণের সূত্রপাত করা ক্ষুদে ফুটবলারদের কদর মোটেও বুঝতে পারেনি আমরা ঠাকুরগাঁওবাসী।

আসুন আমরা মন থেকে নিজ এলাকা ও দেশকে ভালবাসি। ক্ষুদে ফুটবলারদের অবমূল্যায়নের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহন করি, ভাল কাজের জন্য উৎসাহ প্রদান করি সকলকে। এই নতুন প্রজন্মরাই তো আগামীতে দেশের নেতৃেত্ব দিবে। তবেই এগিয়ে যাবে ঠাকুরগাঁও ও প্রিয় বাংলাদেশ।

ক্ষুদে ফুটবলারদের চোখে-মুখে অম্লান দেখে তখন খুব মনে পড়ছিল গায়ক হায়দারের এই গানটি......
কতটুকু অশ্রু গড়ালে হৃদয় জলে শিক্ত?
কত প্রদীপ শিখা জ্বালালেই জীবন আলোয় উদ্দিপ্ত?
কত ব্যথা বুকে চাপালেই তাকে বলি আমি ধৈর্য্য?
নির্মমতা কতদুর হলে ঠাকুরগাঁওবাসী হবে নির্লজ্জ?
আমি চিৎকার করে কাদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার
বুকের ব্যথা বুকে চাপায়ে নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার।।
অবুঝ শিশুর অবুঝ প্রশ্ন কি দিয়ে দেব শান্তনা ......?

তানভীর হাসান তানু

তানভীর হাসান তানু

[email protected]

লেখক: গণমাধম্যকর্মী, ঠাকুরগাঁও 

সম্পাদক

কাজী এম আনিছুল ইসলাম

ভারপ্রাপ্ত প্রকাশক

মোঃ আব্দুল হামিদ

আমাদের সাথে থাকুন
সদ্য সংবাদ