আমি কিছুই অমু না, শুধু মায়ের খাওন যোগামু

প্রকাশঃ বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭    ১৯:৫৮
15

ধানমন্ডি ৩২, ঢাকায় বসবাসরত মানুষের খুব পরিচিত একটি নাম। সম্ভবত একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না যারা একবার হলেও ঢুঁ মারে নি ৩২ এর চত্তর। তবে সকলের কাছে ৩২ এর চীর-চেনা মুগ্ধকর পরিবেশের সঙ্গে কিছু বিষয়ের মিলন ঘটে যা সাধারন্ত সাধারণরা স্বাভাবিকভাবে নেন না। এই বিষয়গুলোর মধ্যে পথশিশুদের চকলেট, ফুল বিক্রি কিংবা অযথা হাত পেতে টাকা চাওয়া। আবার অনেকে পথশিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে তাদের আবদার অনেক সময় মিটিয়ে থাকেন।

রোজকার বিরক্ত করা (কারো কারো কাছে) এক ফুল বিক্রেতা পথশিশুর নাম ভাবনা।বয়স আনুমানিক ৬ কি ৭ হবে। মুখে মিষ্টি ভরা হাসি নিয়েই ফুলের বালতিটা এগিয়ে ধরে বলে একটা ফুল নেন না? একটা ফুল নেন ভাইয়া মুখে হাসি ধরে রেখেই বললো মেয়েটি। প্রয়োজন না থাকায় আমি ফুল নিলাম না তবে ওর প্রতি ভালো লাগা কাজ করলো তাই ওর হাতে টাকা ধরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম বাদাম খাবা? সোজা উত্তর আমি বাদাম খাইনা ভাইয়া। আমিও দেরি না করে বলে ফেললাম তবে তুমি কি খাও? তারপর অনেক কথা…

আমি মেয়েটির কথা শুনে অবাক হচ্ছি কত সাবলিলভাবে তার দু:খ-সুখ আর আবেগানুভুতির কথা বলে যাচ্ছে অবলিলায়।ওর বলা কিছু কথা পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরলাম।

ভাবনার নাম জানতে চাইলে ও হাসিভরা মুখে বলে ওর নাম না কি চারটা! ….ভাবনা, তাজনীম, চৌধুরী আর মায়ে ডাকে মধুর কইরা বদনা। আমি বললাম বদনা কেন?......মায়ে আদর করে ডাহে আমি জানি না বলে আবার একফালি মিষ্টি হাসি।

বাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই চুপ করে গেলো এই মিষ্টি মেয়েটি। আমি তাকিয়ে ওর দিকে। জানালো বাবা অনেক আগেই আরেক বেডির লগে ভাইগ্যা গেছে। মার সাথেই আছে ভাবনার চার ভাই-বোন। এক বোন মারা গেছে অনেক আগেই।

প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম। আমি বাক্যহীন আর মিষ্টি মেয়েটির মুখ থেকে হাসি হারিয়ে গেছে। কথা বলে জানলাম, ভাবনা সকলের ছোট, বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। ভাইটাকে অনেক কষ্টে তার মা পড়ালেখা করাচ্ছে। ওর নিকটতম বড় বোন চকলেট বিক্রি করে আর ও ফুল।

কামরাঙ্গি চরের ছোট্ট একটা ঘরে পরিবারের সকলের সাথেই থাকে ও। মা অনেক আদর করে। সুন্দর করে চুল বেধে দেয়, ঝুটি করে দেয়…..ওর না কি চুল ছোট হওয়ায় মা ভালো করে পিছনে ঝুটি বাধতে পারে না।

আমাদের মতো ভাইয়া-আপুদের কাছে নাকি ও পড়তে যায় তবে ওর খুব কষ্ট হয়। সেখানে না কি প্রচন্ড মশা কামড়ায়। ও মশার কামড় সহ্য করতে পারে না।পড়তে ভালোই লাগে ওর। তবে বড় হয়ে কিছু হওয়ার ইচ্ছে নেই যদিও একবার ভুলে মুখফুটে বলে ফেলে ডাক্তার হবে। পরক্ষণেই বলল না ডাক্তার অমু না। আমি কিছুই অমু না। তবে মায়রে দেকমু। মায়ের খাওন যোগামু। আর কিছু হমু না। আমি অনেকবার বলার পরেও ওর মুখ থেকে আর কিছু বের করতে পারলাম না, বুঝলাম এই ছোট বয়সেই মায়ের দু:খ দেখতে দেখতে মায়ের মুখে একটু হাসি ফোটানো ছাড়া আর কিছু চায় না সে।

ওরে জিজ্ঞেস করলাম বাবা কবে লাস্ট চকলেট, পটেটো চিপস তোমার জন্য আনছে? ও আমার দিকে তাকিয়ে বললো পটেটো চিপস কি?......আমি কিছু বলতে পারলাম না। আমার চোখ ছল ছল করছে।

আরো দীর্ঘক্ষণ কথা হয় ওর সঙ্গে।…..জানা যায় জীবনের প্রাত্যহিক ঘটনা। ভাবনা  কামরাঙ্গি চর থেকে ফুল নিয়ে আসে ৩২ এ, রাত ৭-৮টা পর্যন্ত চলে তার বিক্রির চেষ্টা। সারাদিনের পরিশ্রমে ২৫০-৩০০ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারে সে। দুপুরে তার খিদা লাগে না। সকালে মায়ের হাতে খেয়ে বের হয় সে। রাতে গিয়ে মার হাতে টাকা দেয়। মায়ের আদরে ভালোই আছে এই ছোট্ট পরীটি।

মা না কি খুব সহজে মারে না বলেই একফালি হাসি। মা মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ালে ওর দ্রুত ঘুম পায়। সাধারণ বাচ্চাদের মতো ওর বাইরের খাবার এতটা প্রিয় না। তবে আইসক্রিমটা ওর অনেক ভালো লাগে।

বললাম চলো আমি আইসক্রিম খাওয়াবো…কিন্তু ভাবনাদের বুঝি কপালটা মন্দই থাকে। আমি চারিদিক খুঁজেও আইসক্রিম পেলাম না। ভাবনার দিকে তাকিয়ে বললাম আইসক্রিম তো নেই তাহলে কি খাবা? চটপটি? ও বললো, ঝালমুড়ি। আমি ওর হাতে ঝালমুড়ি তুলে দিয়ে নিজের গন্তব্যে হাটা ধরলাম। আর মনে মনে চিন্তা করলাম ওকে অন্যকোন দিন আইসক্রিম খাওয়াতেই হবে।